জাহীদ রেজা নূর
বিজয়ের মাসে যে লেখাটি লিখতে চাইছি, তাতে একাত্তরের সাংবাদিকতার কথাই থাকবে। অবরুদ্ধ বাংলায় স্বাধীনতাকামী সংবাদপত্রগুলো কীভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, সে কথা বলতে হবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানিদের দালাল হয়ে যারা সাংবাদিক হত্যায় অংশ নিয়েছে, তাদের কথাও বলা হবে। ১৯৭১ সালের বাস্তবতা দিয়ে সে সময়টি বিশ্লেষণ করতে হবে। তথ্য-উপাত্ত থেকে সেই বাস্তবতাকে খুঁজে নিতে হবে।
সংবাদমাধ্যম স্বাধীন কি স্বাধীন নয়, সেটা বোঝা যায়, তাতে কি ছাপা হচ্ছে আর কী দেখানো হচ্ছে, তা অনুধাবন করে। যদি চলমান সরকারের গুণগান ও অন্যদের বিষোদ্গার করা হতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সংবাদমাধ্যম মোটেই স্বাধীন নয়। স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়ে ঘোষণা থাকলেও কেউ সেই স্বাধীনতা ভোগ করার অবস্থায় থাকে না। ১৯৭১ সালেও সে রকম একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, এবং সে সময় সাংবাদিকেরা কীভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছিল, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিৎ।
১৯৭১ সালে আমার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে ইত্তেফাক গুড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এরপর পাকিস্তানে কোনো অঘটন ঘটেনি, তা প্রমাণ করার জন্য পাকিস্তানি সামরিক সরকারই ইত্তেফাক নতুন করে চালু করার দায়িত্ব নেয়। সিরাজুদ্দীন হোসেন প্রথমে সে পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হতে চাননি, পরে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার স্ত্রী মাজেদা বেগমের অনুরোধে দায়িত্ব নেন। শর্ত দেন, নিজে যা বোঝেন, সেভাবেই লেখালেখি করবেন। ১৯৭১ সালের ইত্তেফাকে সিরাজুদ্দীন হোসেনের সেই সাহসী সাংবাদিকতার প্রমাণ পাওয়া যাবে। সেই সময় ইত্তেফাকে তিনি যা যা লিখেছেন, তা নিয়ে আমরা একটা বইও প্রকাশ করেছি ‘জাহান্নামের আগুনে বসিয়া’ নামে। আগ্রহী পাঠক তাতে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।
অবরুদ্ধ নগরীর সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে তার পটভূমি নিয়েও খানিক আলাপ করে নিতে হয়। আর তার বর্ণনা করতে হলে অবধারিতভাবে সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থাটি সম্পর্কেও জানতে হয়। নতুন প্রজন্ম যেন বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে না যায়, সে জন্য ইতিহাসের কাছে নতজানু হয়েই ঘটনার বর্ণনা করতে হবে।
২
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে ইয়াহিয়া-ভুট্টো যে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করেছেন, বাংলার নেতা শেখ মুজিবের হাতে যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না, তার আলামত পাওয়া যাচ্ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাদের ঢাকায় নিয়ে আসার ঘটনায়। একটা ধ্বংসযজ্ঞ যে ক্রমশই কাছিয়ে আসছে, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠন হওয়ার পর থেকেই মিথ্যা, জুলুম, কোটারি স্বার্থ রক্ষা আর বঞ্চনার পাহাড় গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৯৬৬ সাল থেকে ৬ দফার যে আন্দোলন চলছিল, তাতে পূর্ব পাকিস্তানে থাকা তাবৎ বড় নেতাদের ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন বাংলার কণ্ঠস্বর। আওয়ামী লীগ ছাড়াও আরো অনেকগুলো দল ছিল সে সময়, কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগই পেয়েছিল সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন। তাতে অবশ্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলায়নি। অতীতের মতোই বাংলাকে পদদলিত করে রাখার সকল ফন্দি করে রেখেছিলেন ইয়াহিয়া আর ভুট্টো। যার ফলে অপারেশন সার্চলাইটের হত্যাযজ্ঞ সকল আলোচনার সমাধি ঘটাল এবং পূর্ব বাংলার মানুষ দেশ স্বাধীন করার জন্য অস্ত্র তুলে নিল হাতে।
এ রকম এক বাস্তব অবস্থার মধ্যে দেশ নিয়ে পাকিস্তান সরকারের মতলব কী, তা দুটো ঘটনায় প্রকাশিত হয়ে পড়ল। রাও ফরমান আলী ও খাদিম হোসেন রাজার নেতৃত্বে অপারেশন সার্চলাইটের তাণ্ডব যখন চলছে গোটা পূর্ব বাংলায়, তখন ঢাকা শহরের তিনটি পত্রিকাকে গুড়িয়ে দেওয়া হলো। বাঙালির স্বার্থরক্ষায় অবিচল দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ ও দ্য পিপল পত্রিকাগুলোয় চলল এই ধ্বংসযজ্ঞ। অন্যদিকে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার খবর গোপন করার জন্য হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশী সাংবাদিকদের জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো বিমানবন্দরে, সার্চ করে দেখা হলো, তারা এই হত্যাযজ্ঞের কোনো খবর নিয়ে যাচ্ছেন কিনা, সে রকম কিছু নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বিমানে উঠিয়ে দেওয়া হলো তাদের।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এ রকম বিজয় পাবে, সে খবর পাকিস্তানি গোয়েন্দাদেরও ধারণার বাইরে ছিল। তারা যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, তাতে বাংলায় নানা দলের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাবে, এ রকম একটা আভাস ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ পেল ভূমিধ্বস বিজয়। ফলে এ অবস্থায় করণীয় কী, সেটা পাকিস্তান সরকার বুঝে উঠতে পারছিল না। এরই জেরে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা করা হয় এবং চালানো হয় এই হত্যাযজ্ঞ। ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন, আকস্মিক আক্রমণে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হলে বাঙালির পক্ষে আর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। বাঙালির হাতে ক্ষমতাও দিতে হবে না।
ইয়াহিয়া খানের ধারণা যে ভুল ছিল, তা পরবর্তী ঘটনাবলীতেই প্রকাশ পেয়েছে। এই সশস্ত্র যুদ্ধে পাকিস্তানিদের পক্ষ নিয়েছিল কিছু দিকভ্রান্ত চৈনিক বাম আর জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এ ছাড়া সবাই সামিল হয়েছিল এই যুদ্ধে। এটি ছিল জনযুদ্ধ। জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল এই যুদ্ধে।
২৫ মার্চের পর থেকে পাল্টে গিয়েছিল দৃশ্যপট। আশাবাদী যারা ১৫ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ভেবেছেন, ক্ষমতার বরফ গলছে, তারাও বুঝতে পারলেন, দেশ আজ মহা সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে। এ রকম অবরুদ্ধ এক জনপদে কীভাবে কাজ করছিল সংবাদপত্র, সে বিষয়েই কিছু কথা বলব।
৩
টিক্কা খান এ সময় সংবাদপত্রের গলায় লাগাম পরানোর চেষ্টা করেন। বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল ক. পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সংহতির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমালোচনা করা বা করার চেষ্টা, খ. সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমালোচনা গ, জনগণকে বিভ্রান্ত করা বা কোনো প্রকার আতঙ্ক সৃষ্টি করা, ঘ. সশস্ত্র বাহিনী, সরকার, পুলিশ অথবা কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে জনমনে বিদ্রোহের সৃষ্টি করা, ঙ. পাকিস্তান রাষ্ট্র বা কোনো অঞ্চলের বিরুদ্ধে উস্কানী বা অসন্তোষ সৃষ্টির প্রয়াস নেওয়া, চ. সরকারের নিযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া বা কোনো ছাড়পত্র ব্যতীত সব ধরনের রাজনৈতিক খবরাখবর মুদ্রণ নিষিদ্ধ। এই সকল আদেশ লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
এই রকম সামরিক নির্দেশের পর কোনো সংবাদপত্রের পক্ষে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করা দুরূহ। কিন্তু এরই মধ্যে সাংবাদিকেরা চেষ্টা করেছেন সরকারের সমালোচনা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোনো না কোনোভাবে অংশ নিতে। বিশেষ করে সামরিক বিধিনিষেধের মধ্যেই ইত্তেফাক এমন কিছু সংবাদ পরিবেশন করেছে কিংবা এমন কিছু শিরোনাম করেছে, যা থেকে বোঝা যায়, যেমন তেমনভাবে লোক ভুলিয়ে পাকিস্তানি শাসন অব্যাহত রাখা যাবে না।
১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকেই জামায়াতে ইসলামীসহ নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন ঘোষণার দাবি জানায়। এই ধরণের অযৌক্তিক দাবির সমালোচনা করে ইত্তেফাক যে সম্পাদকীয়টি প্রকাশ করে, তার কয়েকটি বাক্য এ রকম:
‘নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাতিল করিয়া দিয়া কোনো কোনো মহল হইতে নূতনভাবে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবী উঠিতে দেখি, তখন প্রমাদ না গুনিয়া পারি না। বলাবাহুল্য, এই দাবীকারীদের মধ্যে সেই সব পুরাতন পরিচিত মুখেরই আমরা দেখা পাই, যাহাদের কেহ বা বিগত নির্বাচনে পরাজিত হইয়াছেন, কিংবা নিজ জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সচেতন বলিয়া নির্বাচনের ধারেকাছেও ঘেষেন নাই, অথবা কেহ মাত্র দুই একটি আসন দখলকারী নেতা।…দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন জনগণের আস্থা ও সহযোগিতা অর্জন একান্তই প্রয়োজন, তখন জনগণের আস্থাভাজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দিয়া সমস্যা সমাধান বা জাতীয় বৃহত্তম স্বার্থ সংরক্ষণ করা যাইতে পারে, এমনটা আমাদের বিশ্বাস নাই। তাই জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করিয়া দিয়া সমস্যা সমাধানের নিত্যনতুন নোখতা যাহারা বাতলাইতেছেন, তাহাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাভাবিক কারণেই আমরা কেবল সন্দিহানই নই-উদ্বিগ্নও বটে।’
মতলববাজদের মতলবি রাজনীতির ব্যাপারে এই সতর্ক অথচ বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে পেরেছিল পত্রিকাটি।
আমরা ধারাবাহিকভাবে সে সময়ের অবরুদ্ধ ঢাকায় বসে যে সাংবাদিকতা করা হয়েছে, তার বিবরণ জানাব পাঠককে। ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়’—গানের এই পংক্তিগুলো যে সত্যে ভাস্বর, সেটা কে অস্বীকার করবে? আর অস্বীকার করলেই কি তা ইতিহাস থেকে মুছে যাবে।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-২
যুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ নগরীতে সাংবাদিকতা করা ছিল কঠিন। তবে যারা পাকিস্তানি বাহিনীর তাবেদারি করেছে, তারা তখন কোনো ধরনের সমস্যায় পড়েনি। বরং পাকিস্তানি সরকারের সুনজরে ছিল তারা।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভৌগলিকভাবে ছিল আজব এক রাষ্ট্র। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিম অংশে ও পূর্ব অংশে দুটি পৃথক রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল। সেটা তো হয়ইনি, বরং হাজার মাইলের ব্যবধানে ভাষা, সংস্কৃতিতে হাজারো অমিল থাকা সত্ত্বেও একটি দেশ হিসেবে গড়ে উঠল পাকিস্তান। পাকিস্তান হওয়ার পর কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে গণ পরিষদ গঠিত হয়নি। ভারত ভাগের আগেই পাকিস্তানের যে সব অঞ্চলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন, তারাই এলাকাভিত্তিক গণপরিষদ সদস্য হয়ে গেলেন। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এরপর আমলাতন্ত্র ও সেনা আমলাতন্ত্রের সহায়তায় গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠাল। এবং সবচেয়ে বড় যে অন্যায়টি করল, তা হলো বাংলাকে তারা শোষণ করতে লাগল। সেই শোষণের অবসানের জন্যই শুরু হয়েছিল স্বাধীকার আন্দোলন। সে আন্দোলন একসময় স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হলো। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও জনগণের সেই প্রত্যাশিত মুক্তি মেলেনি।
সে যুগের সাংবাদিকেরা এই বাস্তবতা জানতেন। ফলে তাদের লেখায়, কার্যকলাপে শোষণ ও বঞ্চনার অবসানের কথা থাকত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরু হলে কড়া সামরিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সব কথা লেখা যেত না। যাদের হাতে পৌঁছুতো সকালের পত্রিকা, তারা বোঝার চেষ্টা করতেন, কোনো ধরনের সাংকেতিক ভাষায় কোনো সংবাদ দেওয়া হচ্ছে কি না। ছিল সে রকম সংবাদ। সে কথাও আমরা আলোচনা করব।
একাত্তরের ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্যাটার্নটি ছিল বিস্ময়কর। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ঢাকা থেকে অপহরণ করা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রথম টার্গেট ছিল সাংবাদিক। ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে শুরু হয়েছিল অপহরণ-পর্ব। আমরা রাও ফরমান আলীর বয়ান থেকে জেনেছি, সেদিন সকালে পিলখানায় সারি বাধা কাদা লেপা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়েছিল। বুদ্ধিজীবীদের নিধন করার জন্যই এগুলো সেখানে অবস্থান করছিল। পাকিস্তানি সেনারা এই বুদ্ধিজীবীদের সবার চেহারা চিনত না। বদর বাহিনীর লোকেরা এই পাকিস্তানিদের সঙ্গে ছিল বুদ্ধিজীবীদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। এদের প্রথম মাইক্রোবাসটি রাতের অন্ধকারে প্রথম এসে হাজির হয় সিরাজুদ্দীন হোসেনের চামেলীবাগের বাড়িতে। আজ শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের ৫৪তম অন্তর্ধান দিবস। ১১ ডিসেম্বর অপহরণ করা হয় সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হক ও আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে। ১২ ডিসেম্বর নিজামুদ্দীন আহমদকে। ১৩ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনকে। ১৪ ডিসেম্বর আবদুল মান্নান (লাড়ু ভাই), শহীদুল্লা কায়সারকে। ১৪ ডিসেম্বরে শহীদ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যুক্ত হন। ১৫ ডিসেম্বর প্রথিতশা চিকিৎসকেরা।
যে শহীদ সাংবাদিকদের কথা বলা হলো, তাদের সবার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। অবরুদ্ধ নগরীতে কীভাবে তাঁরা তাঁদের কর্মতৎপরতা চালাতেন, তার কিছু কথা এখানে বলতে হবে।
নিজামুদ্দীন আহমদ ছিলেন পিপিআই-এর জেনারেল ম্যানেজার। এ ছাড়াও তিনি তখন বিবিসিতে নিয়মিত সংবাদ সরবরাহ করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের সংবাদ মাধ্যমে এখানে ঘটা নারকীয় ঘটনাগুলো প্রকাশ করা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক মাধ্যমে তিনি খবরগুলো পাঠাতেন। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার সংবাদগুলো যখন পাঠাতেন, তখন বোঝা যেত, কতোটা সাহসী ছিলেন তিনি।
ঢাকায় যখন কয়েকটি বিদেশী গণমাধ্যমের প্রতিনিধি এলেন, তখন নিজামুদ্দীন আহমদ এখানে সংঘটিত গণহত্যার সর্বশেষ খবর জানাতেন। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পেও নিয়ে যেতেন তাঁদের।
তাঁকে কিন্তু পাকিস্তানিরা ঠিকই চিনেছিল। রাও ফরমান আলীর দফতরে দুবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। গণহত্যার খবর বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে না পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু তিনি তাঁর কাজ অবিচলিতভাবে করে গেছেন। নিরাপত্তার কারণে বাড়িতে না থেকে তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদগ্ধে সাক্ষ্য দিতে তাঁকে একবার পশ্চিম পাকিস্তানে ডেকে পাঠানো হয়। তিনি কৌশলে তা এড়িয়ে যান। এ কারণে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে।
আ ন ম গোলাম মোস্তফা কোন অপরাধ করেছিলেন? অবরুদ্ধ নগরীতে যখন সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত, কথা বলছেন নিচু স্বরে, তখনও তিনি উচ্চস্বরে কথা বলতেন। স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতেন। ঢাকায় থাকা নিরাপদ কিনা, সে ভাবনাও তার মনে আসেনি একবারের জন্যও। তিনি ভেবেছেন, সাংবাদিকদের কোনো ক্ষতি করবে না সামরিক সরকার। নির্দ্বিধায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। দৈনিক পুর্বদেশে তাঁর যে লেখাগুলো ছাপা হতো, সেগুলো ছিল অগ্নিঝরা রচনা। বিশেষত তাঁর স্বাধীন মত প্রকাশের কারণেই সহজে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হন।
শহীদ হয়েছেন যে সাংবাদিকেরা, তাঁদের প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন তথ্য গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অথবা প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠাতেন। সিরাজুদ্দীন হোসেন ও শহীদুল্লা কায়সার সব সময়ই সবচেয়ে জরুরি সংবাদটি পাঠিয়ে দিয়েছেন নানাজনের হাতে।
পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত কিছু অসাধারণ শিরোনাম ও রিপোর্টের কথাও এই পর্যায়ে বলতে হবে।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৩
পাকিস্তানপন্থী সংবাদপত্রগুলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে পাকিস্তান সরকারের তাবেদারি করেছে। শুধু তাবেদারি করেছে, তা নয়, মুক্তিকামী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। যেমন জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও ছিল। অধিকাংশ পত্রিকার সাংবাদিকেরা বাংলার এই আন্দোলনকে সমর্থন করতেন বলে তারা চেষ্টা করতেন সত্য সংবাদ পাঠককে জানাতে।
একাত্তরের পত্রিকাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করলে কৌশলী সাংবাদিকতার বিষয়টি নজরে পড়ে। এই সময়ের পত্রিকাগুলো নিয়ে কেউ সুচারু গবেষণা করেছেন বলে আমার জানা নেই। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল ইয়াহিয়া সরকার। ৬ দফা তখন পরিণত হয়েছিল ১ দফায়। স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো সমাধান তখন আর ছিল না। পুরো নয় মাস জুড়েই ক্ষমতা নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা যখন চলেছে, তখন পত্রিকার পাতায় সরাসরি কিছুই লেখা যেত না। লিখতে হতো কৌশলে।
পাকিস্তান সরকারের জানা ছিল, একমাত্র দৈনিক সংগ্রাম ছাড়া ঢাকা থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ সংবাদপত্রগুলোর সাংবাদিকেরাই ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। কিন্তু প্রকাশ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কিছু প্রকাশ করা তাদের জন্য ছিল দুরূহ। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সাংবাদিকদের এই সমর্থনকে ভয় পেত সামরিক সরকার। তাই পত্রিকায় যে কোনো রাজনৈতিক সংবাদ ছাপার আগে তা প্রকাশের জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হতো। অর্থাৎ প্রি-সেন্সর বলবত হয়েছিল।
পত্রিকাগুলো যেন বশে থাকে, তা নজরদারি করার জন্য সিদ্দিক সালিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। মেজর। কিন্তু তাঁকে দেওয়া হয়েছিল জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব। দৈনিক পাকিস্তানের সাংবাদিকদের অনেকেই ছিলেন আন্দোলন সমর্থক। ফলে তাদের ওপরও রাখা হয়েছিল কড়া নজর। অগত্যা দৈনিক বাংলা নিজস্ব সম্পাদকীয় প্রকাশ না করে মর্নিং নিউজের ইংরেজি সম্পাদকীয় অনুবাদ করে ছাপাতে শুরু করে। এটাও সামরিক কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে যায়। তারা দৈনিক বাংলাকে বাধ্য করেন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পাদকীয় লিখতে। পত্রিকা মনিটরিং-এর দায়িত্বে ছিল আইএসপিআর (ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস)। একাত্তরের জুলাই মাস থেকেই আইএসপিআর সকল পত্রিকা অফিসে (প্রেস অ্যাডভাইস’ পাঠাতে শুরু করে। নামে পরামর্শ হলেও কাজে তা ছিল নির্দেশ। কী কী সংবাদ ছাপা যাবে, কোন সংবাদ ছাপা যাবে না—তা নির্ধারণ করে দিত এই নির্দেশমালা।
তারই কিছু নমুনা এখানে রাখব।
১৯৭১ সালের ১৫ জুলাই এ রকম এক নির্দেশে বলা হয়, কোনো বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করা যাবে না। মুক্তিফৌজ, মুক্তিবাহিনী, গণবাহিনী, বাংলাদেশ, জয় বাংলা—এ সব শব্দ পত্রিকায় লেখা যাবে না। শুধু তাই নয়, ‘তথাকথিত মুক্তিবাহিনী’ও লেখা যাবে না। যদি লিখতে হয়, তাহলে লিখতে হবে ‘বিদ্রোহী’ কিংবা ‘ভারতের এজেন্ট’।
৩০ সেপ্টেম্বর এল আরেক নির্দেশ। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পিতা-মাতা ও পরিবার সম্পর্কে কোনো খবর প্রকাশ করা যাবে না। ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর বাবা ও মায়ের অসুস্থতা নিয়ে সিরাজুদ্দীন হোসেন যে খবর ছেপেছিলেন, তারই প্রতিক্রিয়া ছিল এটা।
এরপরের বাধা এল তাহরিকে ইশতেকলাল পার্টির সভাপতি এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খানকে নিয়ে। এই নির্দেশে বলা হলো, আসগর খানের বক্তৃতা-বিবৃতি ছাপা যাবে না, কিন্তু তার বিরুদ্ধে সমালোচনা হলে ছাপা যাবে। এই নির্দেশের তারিখ ছিল ৩ অক্টোবর। নেগেটিভ নিউজও নিউজ—এই কথা উপলব্ধি করে ৬ অক্টোবর এল আরেক নির্দেশ—আসগর খানের সমালোচনাও ছাপা যাবে না।
যারা একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে কিছু জানতে ইচ্ছুক, তাদের বলে রাখি, আসগর খান খুবই দায়িত্বশীল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত এই সামরিক কর্মকর্তা বাংলার স্বাধীকার আন্দোলনের পক্ষে নিজের অবস্থান ষ্পষ্ট করেছেন। তাঁর লেখা ‘জেনারেল ইন পলিটিক্স ১৯৫৮-১৯৮২’ নামের বইটি পড়লে এ সময়কার অনেক খবর উৎস্যুক পাঠক পাবেন। বইটির বাংলা অনুবাদও হয়েছে।
আসগর খানের প্রতি পাকিস্তান সরকার সে সময়ে এতোটা কঠোর হলো কেন, তাও জেনে রাখা দরকার। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় আসগর খান ঢাকায় এসেছিলেন, নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আরেকবার তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। সে সময় তিনি এক সংবাদ সম্মেলন করেন এবং হত্যা ও নির্যাতনের জন্য শান্তি কমিটির লোকদের কঠোর সমালোচনা করেন। গভর্নর মালিকের মন্ত্রীসভার সমালোচনা করেন তিনি। এই অযোগ্য লোকদের মন্ত্রী পদে রেখে ঘোষিত উপ নির্বাচন হতে পারে না বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তারই প্রতিক্রিয়ায় আসগর খানের খবর প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
এইসব নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নিয়েই সে সময় প্রকাশিত হতো পত্রিকা। এবং কীভাবে এই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে জনগণের কাছে মুক্তি বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রকাশ করা হতো, সে বিষয়েই কথা হবে এরপর।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৪
‘জয় বাংলার’ জয়—১৯৭১ সালের ৫ মার্চ এটাই ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম। সাংবাদিকতার ছাত্রমাত্রেই জানেন, শিরোনাম তৈরিতে সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন অতুলনীয়। ৩ মার্চে প্রকাশিত ইত্তেফাক পত্রিকিার প্রধান শিরোনাম তিনি দিয়েছিলেন ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’।
‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি কোনো দলের সম্পত্তি ছিল না। ১৯৭১ সালে এই শ্লোগানই হয়ে উঠেছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের প্রাণের শ্লোগান। ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম’ তথ্যচিত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের যে সমাবেশের ছবি দেখানো হয়, সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা সমস্বরে দুটি শ্লোগান উচ্চারণ করেছিলেন, ‘জয় বাংলা’ ও ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব।’
মুক্তিযুদ্ধের গোটা সময় জুড়ে এই শ্লোগান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে এই অঞ্চলে।
অবরুদ্ধ দেশে ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটি পত্রিকার পাতায় প্রকাশ করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু সেটাও কৌশলে ব্যবহার করেছিল ইত্তেফাক। সে কথাই বলব এখন।
প্রবাসে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর তাদের কথা বলার জন্য একটি সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। মুক্তি সংগ্রাম, রণাঙ্গণের সংবাদ, উদ্বাস্তুদের অবস্থা, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বিশ্ব জনসমর্থন আদায়ের জন্য সরকারের মুখপত্র হিসেবে যে পত্রিকাটির জন্ম হয়, সেটির নাম ছিল‘ জয় বাংলা’। ২২/১ বালু হক্কাক লেন থেকে প্রকাশিত এই সাপ্তাহিকটির প্রকাশক ছিলেন আবদুল মান্নান এমএনএ। সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। সেই পত্রিকাটিকে যখন পাকিস্তান সরকার ভারতীয় ছলনা বলে আখ্যায়িত করল, তখন কালবিলম্ব না করে ইত্তেফাকে তার শিরোনাম হলো, ‘জয় বাংলা পত্রিকা ভারত সরকারের নয়া ছলনা’। দেশের পাঠক বুঝে গেল, প্রবাসে বাংলাদেশ সরকার ‘জয় বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাচ্ছে এবং তা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে সহায়তা করছে।
মুক্ত দেশে বসে সাংবাদিকতা করা অপেক্ষাকৃত সহজ। তাতে ঘাতকের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আশঙ্কা কম। কিন্তু অবরুদ্ধ দেশে? কেন সাংবাদিকেরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন অবরুদ্ধ দেশে, সেটা তাদের সাহসী সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রতি অবিচল আস্থা দিয়েই বর্ণনা করা যায়। সে ব্যাপারে আলোকপাত করার আগে অবরুদ্ধ বাংলায় যে বিদেশি সাংবাদিকেরা এসেছিলেন, দেখে গেছেন জেনোসাইড, ফিরে গিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, তাদের প্রতিবেদনগুলো নিয়েও কিছু কথা বলা দরকার।
২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের সময় বিদেশি সাংবাদিকদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এরপর তাদের ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই সাংবাদিকেরা উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার খবর বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রচার করার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। ২৫ মার্চ ম্যাসাকার শুরু হওয়ার পর যখন সাংবাদিকদের বহিষ্কার করা হচ্ছিল, তখন সাইমন ড্রিং ও এপি’র ফটোসাংবাদিক মিশেল লঁরে লুকিয়ে থেকে গিয়েছিলেন ইন্টারকন্টিনেন্টালেই। ২৭ মার্চ সকালে সান্ধ্যআইন শিথিল হলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের খাবারবাহী গাড়িতে করে তাঁরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে জেনোসাইডের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেন। তাঁদের পাকিস্তান থেকে বের করে দেওয়া হলেও সাইমন ড্রিং-এর লুকনো তথ্য-উপাত্ত হাইজ্যাক করতে পারেনি পাকিস্তান সরকার। এরপর ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লন্ডনের ডেইলি ট্রেলিগ্রাফ পত্রিকায় সাইমন ড্রিং-এর প্রতিবেদনটি ছাপা হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যপক সাড়া জাগায়। তারা বুঝতে পারে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়া সরকার জেনোসাইড ঘটিয়েছে। ড্রিং-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তানে ট্যাংক আক্রমণ: ৭০০০ নিহত, ঘরবাড়ি ভষ্মীভূত’। সাইমন ড্রিং অবরুদ্ধ ঢাকায় বসেই এই নৃশংসতা দেখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহ এবং অখণ্ড পাকিস্তানের’ নামে শুরু করা লড়াইয়ে ঢাকা এখন ধ্বংস এবং ভীতির নগরী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঠাণ্ডা মাথায় ২৪ ঘণ্টাব্যাপী অবিরাম শেল বর্ষণে সেখানে ৭ হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, ঢাকাসহ সবমিলিয়ে এ অঞ্চলে সেনা অভিযানে ১৫ হাজার লোক নিহত হয়েছে।’ (অনুবাদ সম্পাদনা: দাউদ হোসেন, মূল সংগ্রহ ও সম্পাদনা: ফজলুল কাদের কাদেরী, বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, সংঘ প্রকাশন, ২০০৩।)
অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীতে এসেছিলেন পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাস। পূর্ব পাকিস্তানে কোনো জেনোসাইড ঘটেনি, সে কথা প্রমাণ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের ৮ জন সাংবাদিককে পূর্ব বাংলা সফরে এনেছিল পাকিস্তান সরকার। উদ্দেশ্য ছিল, এই সাংবাদিকেরা তাদের লেখনিতে প্রমাণ করে দেবেন, পূর্ব বাংলায় সবকিছুই চলছে সাধারণ নিয়মে। কোনো গোলাগুলি, হত্যাকাণ্ড ঘটেনি এখানে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিয়ে যাওয়া হবে এবং বলা হবে, জেনোসাইডবিষয়ক সবকিছুই মিথ্যে প্রচারণা।
অ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাস তখন করাচির মর্নিং নিউজ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক এবং সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তানস্থ সংবাদদাতা। এপ্রিলের কোনো এক সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ৮ জন সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। বাকি ৭ সাংবাদিক সামরিক সরকারের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রতিবেদন লেখেন। ব্যতিক্রম ছিলেন অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস। ১৮ মে তিনি লন্ডনের সানডে টাইমস অফিসে এসে বলেন, পূর্ব বাংলায় যে ম্যাসাকার হয়েছে, তা নিয়েই লিখতে চান তিনি। বলতে চান, কেন ৫০ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবেদন লিখলে করাচিতে আর ফিরে যাওয়া যাবে না।
ম্যাসকারেনহাস তখন একটা পথ বাতলে দিলেন পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে। তিনি করাচিতে যাবেন, স্ত্রী-সন্তানদের লন্ডনে পাঠিয়ে দেবেন, তারপর সুযোগ বুঝে নিজেও চলে আসবেন লন্ডনে। এরপর ছাপা হবে তাঁর লেখা প্রতিবেদন।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৫
করাচি থেকে স্ত্রী ও ৫ সন্তানকে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়ার পরই কেবল তাঁর প্রতিবেদন ছাপা হবে, এই শর্তে দ্য সানডে টাইমস রাজি হয়। স্ত্রী ও সন্তানদের বিদেশ সফরের ব্যাপারে সরকার কোনো বাধা দিল না। তখন মাসকারানহাস সাংকেতিক ভাষায় সানডে টাইমসের এক নির্বাহীকে টেলিগ্রাম পাঠালেন, ‘রফতানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন। সোমবার মাল বোঝাই শুরু।’
এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কিন্তু পাকিস্তান সরকার মাসকারানহাসের দেশত্যাগের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিলো। কীভাবে পাকিস্তান থেকে বের হওয়া যায়, সে চিন্তা করতে থাকলেন তিনি। অবশেষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তার সাহায্যে তিনি গোপনে একটি বিমানে চড়ে বসেন এবং নিরাপদে লন্ডনে পৌঁছে যান। ধর্মবিশ্বাসে মাসকারেনহাস ছিলেন গোয়ানিজ খ্রিস্টান। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই তিনি পাকিস্তানের নাগরিক।
মাসকারেনহাস তাঁর দেশে মর্নিং নিউজ পত্রিকায় যে প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন, সেটি অন্য ৭ সাংবাদিকতার মতোই দালালিতে পরিপূর্ণ। কারণ, এই প্রতিবেদন লেখার জন্যই পাকিস্তান সরকার তাদের পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে লেখার জন্য ব্যকুল হয়ে ছিলেন।
দ্য সানডে টাইমসে লেখা তাঁর প্রতিবেদনটি ছিল বেদনায় ভরা। ১৩ জুন সানডে টাইমসে মাসকারেনহাসের লেখাটি ছাপা হয় ‘জেনোসাইড’ নামে। বিশাল সে প্রতিবেদনটি পড়লে পূর্ব পাকিস্তানে ঘটা জেনোসাইডের ব্যাপারে আর সংশয় থাকে না।
মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন থেকে কিছুটা অংশ তুলে দিচ্ছি।
তিনি লিখছেন, ‘…প্রায় ২০০ গজেরও কম দূরে একটি হাঁটু সমান উঁচু ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে একজন লোককে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়।
আমি চিৎকার করে উঠি, ‘আল্লাহর দোহাই, গুলি ছুড়ো না। লোকটি নিরস্ত্র সে একজন গ্রামবাসী মাত্র।’
রাঠোর আমার দিকে ঘৃণাভরে তাকায় এবং সতর্কতামূলক একটি গুলি ছোড়ে।
লোকটি সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে মাথা গুঁজে গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে গেলে দুজন সেপাই তাকে ধরে আনতে ছুটে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করার আগেই তার কাঁধে রাইফেলের বাট দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দেওয়া হলো।
‘কে তুই?’
‘দয়া করুন সাহেব, আমার নাম আব্দুল বারী। আমি ঢাকার নিউ মার্কেটের একজন দর্জি।’
‘আমার কাছে মিথ্যা বলিস না। তুই হিন্দু, দৌড়াচ্ছিলি কেন?’
‘এখন প্রায় কারফিউ শুরুর সময়। আমি তাই বাড়িতে যাচ্ছিলাম।’
‘সত্যি বল, দৌড়াচ্ছিলি কেন?’
লোকটি জবাব দেওয়ার আগেই একজন সেপাই গোপন অস্ত্রের খোঁজে তার গায়ে হাত চালায়। আর অন্য একজন সৈন্য দ্রুত টান মেরে তার লুঙ্গি খুলে ফেলে। হাড় জিরজিরে লোকটি উলঙ্গ হয়ে পড়ায় তার খতনা করা লিঙ্গ দেখা যায়—যা মুসলমান মাত্রের জন্যই বাধ্যতামূলক।
এ থেকে খোলাখুলিভাবে বোঝা যায় যে বারী হিন্দু নয়।
এবার জেরা চলতে থাকে।‘
(অনুবাদ সম্পাদনা: দাউদ হোসেন, মূল সংগ্রহ ও সম্পাদনা: ফজলুল কাদের কাদেরী, বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, সংঘ প্রকাশন, ২০০৩।)
এটা হচ্ছে ওই প্রতিবেদনের সবচেয়ে শান্তিময় অংশ। এ ছাড়া প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিকেশ করে দেওয়ার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা নৃশংসতার চূড়ান্ত। যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তাদের বলব এই প্রতিবেদনটি পড়ে নিতে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। ২১ জুন পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোয় ছাপা হয় রিপোর্টটির ব্যাপারে সরকারি মুখপাত্রের ভাষ্য।
সরকারি ভাষ্য ছিল এ রকম:
‘রাওয়ালপিন্ডি, ২০ শে জুন, পিপিআই। আজ জনৈক সরকারি মুখপাত্র পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে করাচির মর্নিং নিউজ পত্রিকাযর সাবেক সহকারী সম্পাদক মিস্টার এন্টনি মাসকারেন হাসের বিবরণকে পূর্ণাঙ্গ নির্ভরযোগ্য বা ফাস্ট হ্যান্ড কোনোটিই নয় বলিয়া আখ্যায়িত করেন। গত ১৩ই জুন লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় এই বিবরণ প্রকাশিত হয়।
সরকারি মুখপাত্র দফাওয়ারীভাবে এই বিবরণ খণ্ডন করিয়া বলেন যে, কুমিল্লা ও ঢাকার আশেপাশের সীমিত এলাকা হইতে পরোক্ষভাবে সংগৃহীত স্রেফ শূন্য কথার উপর ভিত্তি করিয়াই মিস্টার ম্যাসকারেন হাস তাহার এই ডেসপ্যাচ তৈরি করেন।
সরকারি মুখপাত্র বলেন যে, বিদেশি সাংবাদিকরা ম্যাসকারেন হাসের ডেসপ্যাচের বহু আগেই তাহাদের ডেসপ্যাচ পাঠান। তাহাদের এইসব ডেসপ্যাচের সঙ্গে ম্যাসকারেন হাসের বিবরণের তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রহিয়াছে। এইসব বিদেশী সাংবাদিকের পূর্ব পাকিস্তানের সকল এলাকায় অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল।
মুখপাত্র বলেন যে, গত ২রা মে ঢাকা হইতে প্রেরিত মিস্টার ম্যাসকারেন হাসের পূর্ববর্তী ডেসপ্যাচের সঙ্গে সানডে টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত তাহার পরবর্তী ডেসপ্যাচের কোনো সঙ্গতি নাই। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে প্রথম ডেসপ্যাচটি চাপ প্রয়োগ করিয়া লেখা হয় নাই অথবা উহা বাস্তব ঘটনার দিক হইতে অসত্য ছিল না।’
আমরা এই অংশটি ২১ জুনের ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে নিয়েছি।
মাসকারেনহাস যখন অবরুদ্ধ বাংলাদেশ থেকে মর্নিং নিউজে খবর পাঠিয়েছেন, তখন তিনি সরকারি ভাষ্যই লিখতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার পরই কেবল সত্য লিখতে পেরেছেন। এই তথ্য থেকে বোঝা সহজ হবে যে, অবরুদ্ধ বাংলায় বসে বাঙালি সাংবাদিকেরা জীবনের পরোয়া না করে কীভাবে সাংবাদিকতা করে গেছেন।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৬
সায়মন ড্রিং ও অ্যান্থনি মাসকারানহাসের প্রতিবেদনের কথা বলা হলো। আরো অনেক বিদেশি সাংবাদিকের নামও বলা যাবে, যারা পূর্ব পাকিস্তানে এসে সরজমিনে দেখেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংসতা। এখানে বলে রাখা দরকার, এই সাংবাদিকেরা কেবল তখনই তাদের প্রতিবেদন ছাপতে পেরেছেন, যখন পৌঁছে গেছেন নিরাপদ ঠিকানায়। পাকিস্তানে বসে এই লেখাগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো বলে মনে হয় না।
এখানে আরেকজন বিদেশি সাংবাদিকের কথাও বলা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সাংবাদিক তাদের দেশের পত্রিকায় প্রথম এই গণহত্যার কথা ছাপেন। আমরা ডান কগিনের কথা বলছি। তিনি ছিলেন টাইম ম্যাগাজিনের সংবাদদাতা। ২৫ মার্চের তাণ্ডবের পর যে সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বের করে দেয় পাকিস্তানি জান্তা, ডান কগিন ছিলেন তাদেরই একজন। ঢাকা থেকে বহিস্কারের পর তিনি ভারতের পশ্চিম বাংলায় চলে যান। সেখান থেকে মোটর সাইকেলে করে পূনরায় সীমান্ত অতিক্রম করেন। এরপর গোপনে বাসে-ট্রাকে-সাইকেলে করে ঢাকা শহরে ঢুকে পড়েন। ঢাকা থেকে খবর সংগ্রহ করে ফিরে আসেন ভারতে। এরপর তিনি তাঁর ম্যাগাজিনের জন্য পাঠিয়ে দেন ইয়াহিয়ার কুকীর্তির খবর।
এপ্রিলে ঢাকা যে মৃত নগরী, সে কথা তাঁর লেখার উল্লেখ করেছেন কগিন। হাজার হাজার লোক এই শহরে নিহত হয়েছেন এবং শহরের অর্ধেক মানুষ শহর থেকে পালিয়ে গেছেন। শহরের ১৮টি বাজারের ১৪টিই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটিতে বাজার পুড়িয়ে দেওয়ার বর্ণনায় এ কথাও পেয়েছিলাম যে, ঠাটারি বাজারে পশু কোরবানির পাশাপাশি কসাইদেরও জবাই করেছিল হানাদার বাহিনী।
সে সময় শহরের প্রায় সব বাড়িতেই উড়ত পাকিস্তানের পতাকা। জিন্নাহ এবং ইয়াহিয়ার ছবিও দেখা গেছে যত্রতত্র। কগিন বুঝে গেছেন, এগুলো বাহ্যিক বিষয়। বাঙালিদের মনে তখন জ্বলছে আগুন। যুদ্ধে তাদের হার হয়নি, এটা তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। প্রতিরোধ ও প্রতিরোধের স্পৃহা তখন বাঙালির মনে। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বাঙালিরা তার সামনে মেলে ধরেছে তাদের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি। মসজিদ থেকে বৃদ্ধকে টেনেহিচড়ে বের করে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বোঝানো হয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা আসলে ছদ্মবেশী হিন্দু।
পুরনো ঢাকাকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। বাড়িগুলোয় পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ বাইরে পালাতে গেলে মেশিনগানের গুলি চালানো হয়েছে।
টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত কগিনের প্রতিবেদনটি ছাপা হওয়ার পর ১১ মে তারিখে তা কলকাতার জয় বাংলা পত্রিকায় পুণর্মুদ্রিত হয়। কগিন সে লেখায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘বর্ষাকাল আসছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে ভয়ঙ্কর সংকট। ইসলামাবাদকে হয়তো বুঝতে হবে, কেবল গায়ের জোরে একতা রক্ষা করা যায় না এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্না ঠিক এমনি পাকিস্তানের কথা কখনও চিন্তা করেননি।’
২৩ মে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘সাংবাদিক নিহত’ শিরোনামে ছাপা একটি খবরে বলা হয়, ‘আর একটি বিশ্বস্থ সূত্রে পাওয়া খবরে প্রকাশ, ইত্তেফাক পত্রিকার প্রাক্তন চিফ রিপোর্টার শ্রী খন্দকার আবু তালেব সম্প্রতি অবাঙালিদের হাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন।
খন্দকার আবু তালেব শহীদ হয়েছিলেন ২৯ মার্চ। একজন উর্দুভাষী অবাঙালি সহকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন তিনি। অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে প্রথম শহীদ সাংবাদিক হলেন খন্দকার আবু তালেব। শহীদ আবু তালেবের বাড়ি ছিল মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে। মিরপুর এলাকা স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্তানা ছিল। ২৪ মার্চ খন্দকার আবু তালেব তার পরিবারের সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন চামেলীবাগে তাঁর বোনের বাড়িতে। ২৫ মার্চ তিনি সেখানে বন্ধু সিরাজুদ্দীন হোসেনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে রাত ১০টার পর বাড়িতে ফেরার পর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হয়। চামেলীবাগের অবস্থান রাজারবাগের পাশেই। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ফেলে আসতে থাকেন আবু তালেবের বোনের বাড়িতে। ভয় পেয়ে তারা দেয়াল টপকে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ২৭ মার্চ খন্দকার আবু তালেব সবাইকে নিয়ে বোনের বাড়িতে ফিরে আসেন। ২৮ তারিখে সান্ধ্যআইন শিথিল হলে তিনি ইত্তেফাক অফিসে যান। ২৫ মার্চ রাতেই গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ইত্তেফাক। তিনি ভস্মীভূত অফিসে কিছু লাশ দেখেন। মিরপুরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন তিনি। মিরপুরে তখন মাথায় লালপট্টি বেঁধে বিহারীরা বাঙালিদের হত্যা করে বেড়াচ্ছিল। আবু তালেব মনস্থির করেছিলেন এই অবস্থায় তিনি মিরপুরে যাবেন না। কিন্তু নিয়তি তাঁকে মিরপুরেই টেনে নিয়ে যায়। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তাঁর ক্ষুরধার লেখনিতে ফুটে উঠত এই অরাজকতা। কিন্তু ২৯ মার্চ তিনি মিরপুরে গেলে বিহারীরা তাঁকে জবাই করে। তাঁর লাশ খণ্ডবিখণ্ড করে রাখা হয়।
রাজনীতিসচেতন ছিলেন খন্দকার আবু তালেব। আওয়ামী লীগের ছয় দফা বাংলায় অনুবাদ করে সান্ধ্যদৈনিক আওয়াজে ছেপেছিলেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অনুবাদও করেছিলেন তিনি।
অবরুদ্ধ ঢাকায় মার্চের নৃশংসতার মধ্যেই তিনি শহীদ হয়েছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরেরা তখন রক্তের নেশায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৭
‘বেআইনী ঘোষিত’ কথাটি এখনও একটি মুখরোচক আলোচনা হিসেবে রয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তানের সামরিক সরকার। প্রবল সেন্সরশিপের মধ্যেই চলছিল পত্রিকাগুলো। সিরাজুদ্দীন হোসেন এই স্থবিরতা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে লাগলেন। আজকের লেখায় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের কিছু ঘটনা দিয়ে কীভাবে আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিবুর রহমানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা হলো, তা নিয়ে আলোকপাত করব।
ইরাননে এক সাক্ষাৎকারে পিপিপি (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রস্তাব রেখেছিলেন, বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করার। এ প্রস্তাবে মর্মাহত হয়েছিলেন পিডিবি নেতা নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান।
পিপিআই পরিবেশিত খবরটি ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছিল ১২ই জুলাই। খবরের শিরোনাম ছিল ‘নবাবজাদা নসরুল্লাহ মর্মাহত হইয়াছেন’। শোল্ডার ছিল ‘বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভুট্টোর প্রস্তাবে’।
১২ জুলাই ইত্তেফাকের মূল শিরোনাম ছিল মরক্কো বিষয়ে। মূলত মরক্কো সামরিক অভ্যুত্থান হওয়ার পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা থেকে বেরিয়ে এসে বাদশাহ হাসান ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছিলেন। কিন্তু পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার ডানদিকের তিন কলাম জুড়ে ছাপা হয়েছিল কিসিঞ্জারের (ইত্তেফাক লিখেছিল কিসিংগার) পাকিস্তান সফর নিয়ে একটি রিপোর্ট। তিন দিন পাকিস্তানে অবস্থানের পর কিসিঞ্জার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। পাকিস্তানি পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন যে কিসিঞ্জার তথ্যানুসন্ধান মিশনে এসেছিলেন, কোন নির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে আসেননি।
এই খবরটির নিচেই ছাপা হয়েছিল নবাবজাদার নসরুল্লাহর খবরটি। নসরুল্লাহ বলেছিলেন, একটি আপস ফর্মুলা উদ্ভাবনের জন্য বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আলোচনা করা উচিত বলিয়া জনাব ভুট্টো যে প্রস্তাব দিয়াছেন তাহাতে তিনি মর্মাহত হইয়াছেন।
নবাবজাদা বলেন, পাকিস্তানের যে কেহ বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা চালানোর প্রস্তাব দিলে তিনি আমাদের জাতীয় স্বার্থের চরম ক্ষতি করিবেন।
ভুট্টো ইরানি একটি পত্রিকাযর প্রতিনিধির কাছে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তা নিয়া নাসরুল্লাহ বলেন, এই সাক্ষাৎকারে জনাব ভুট্টো আরো বলেন যে সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যায় সমাধান করিতে পারিবে না বিধায় যথা শীঘ্র বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।
পিডিপি নেতা আরো বলেন, ইতিমধ্যে রাশিয়া ও অন্যান্য পশ্চিমি দেশ আমাদের উপর প্রবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করিয়াছে এবং ভারতীয় প্রচারণায় চালিত হইয়া তাহারা রাজনৈতিক সমাধানের জন্য হইচই করিতেছে। এমতাবস্থায় বিদেশের মাটিতে বসিয়া জনৈক পাকিস্তানি নেতা যে দুর্ভাগ্যজনক উক্তি করিয়াছেন, তাহাতে আমাদের দুশমনদের হাতই শুধু শক্তিশালী হইবে না, সেই সাথে বাংলা দেশ দুষ্কৃতিকারীদের মনবল বৃদ্ধি পাইবে।
তিনি আরো বলেন যে, ইহাতে পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিকরাও হতাশ হইয়া পড়িবেন। অথচ ইহারাই জনসাধারণের মধ্যে আস্থা ফিরাইয়া আনার জন্য অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে প্রদেশের সর্বত্র শান্তি কমিটি গঠন করিয়াছেন এবং আওয়ামীলীগ বিশ্বাসঘাতক ও ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রাজাকার বাহিনী গঠনের কাজে নিয়োজিত রহিয়াছেন।
নবাবজাদা নসরুল্লাহ বলেন, ভাবিতে আশ্চর্য লাগে ইনি কি সেই ভুট্টো যিনি সামরিক ব্যবস্থা ও শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পর করাচি বিমানবন্দরে বলেন, ‘আল্লাহকে ধন্যবাদ পাকিস্তান বাঁচিয়া গিয়াছে।’
কিসিঞ্জারের সঙ্গে বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের ডঃ কামাল হোসেনের বৈঠক হয়েছে এরকম একটি খবর ছড়িয়ে পড়লে ইসলামাবাদ থেকে এপিপি জানায় যে খবরটি সত্য নয়। এই খবরটিও ছাপা হয় ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায়।
ইত্তেফাক এই খবর দুটি এত গুরুত্ব দিয়ে কেন ছাপলো?
যুদ্ধকালীন সাংবাদিকতার যে অনন্য নজির এইসব সংবাদে দেখা যাবে তা ক্রমশ আলোচিত হবে।
আওয়ামী লীগ শেখ মুজিব বাংলাদেশ ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ ছিল তখন। নবাবজাদা নজরুল্লাহ খান এই শব্দগুলো উচ্চারণ করায় তা লুফে নিল ইত্তেফাক। সিরাজুদ্দীন হোসেন ঠিক করলেন এই কথাগুলো রাখতে হবে পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়।
মজার ব্যাপার হলো, ইরানি সংবাদ সংস্থার এই খবরটি বিবিসি প্রচার করলে ভুট্টো তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার আহ্বান তিনি জানাননি।
এই খবরটিও ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। রিপোর্টটি ছিল এরকম, পিপিপি প্রধান জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো ইরানে অবস্থানকালে পাকিস্তান সরকারকে বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের সহিত আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানাইয়াছেন বলিয়া বিবিসি যে রিপোর্ট প্রচার করে, জনাব ভুট্টো উহার সত্যতা অস্বীকার করেন।
গতকাল সন্ধ্যায় এখানে সাংবাদিকদের শহীদ আলোচনাকালে তিনি বলেন যে, বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশের সহিত আলোচনার প্রশ্নই উঠে না এবং উহার কোন অবকাশই থাকিতে পারে না। তিনি বলেন, তাহার অভিমত হইল এই যে, বিচ্ছিন্নতাবাদের সহিত যাহাদের কোন সম্পর্ক নাই এই রূপ আওয়ামী লীগারের সহিত আলোচনা চলিতে পারে। বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত ঢাকায় বহু ঘন্টা আলোচনার প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া জনাব ভুট্টো বলেন যে, তিনি তাহাকে (শেখ মুজিবুর রহমানকে) স্বমতে আনয়নের চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু শেখ সাহেব বাস্তববাদী মনোভাবের পরিচয় প্রদানে ব্যর্থ হন। উপরন্তু শেখ মুজিবুর রহমান যখন জাতীয় পরিষদকে দ্বিধা বিভক্ত করার আহ্বান জানান, তখনই দেশকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট হইয়া ওঠে।
অতঃপর সরকার আওয়ামীলীগকে বেআইনি ঘোষণা করেন আর এই ব্যাপারে পিপলস পার্টির ভাষ্য হইল জাতীয় পরিষদের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকিবে এবং শুধু ওই সকল আওয়ামীলীগ সদস্য আসন হারাইবে যাহারা বিচ্ছিন্নতাবাদের সহিত জড়িত রহিয়াছে।
এই রিপোর্ট থেকেও পরিষ্কার হয় যে ভুট্টো-ইয়াহিয়া যুক্তি করেই আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা দিতে চেয়েছিল। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানিরাই যে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল, সেটাও পরিষ্কার হলো।
দৈনিক ইত্তেফাক জুলাই মাস থেকেই বিভিন্নভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ-বাংলাদেশ-শেখ মুজিব’ ইত্যাদি শব্দ প্রকাশ করতে শুরু করলো এবং অবরুদ্ধ বাংলার পাঠকেরা এই সাংকেতিক ভাষা থেকে সত্য খুজে নিতে লাগল।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৮
যে কোনোভাবে ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটি লেখার সুযোগ পেলে তা হাতছাড়া করা যাবে না—এই নীতি নিয়েছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন। ৭ জুন ইসলামাবাদ থেকে বার্তা এলো। বলা হলো ‘জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ’ চিহ্নযুক্ত নোট নাকি আসছে পাকিস্তানে। সেগুলো অবৈধ। পাঠক, খেয়াল করে দেখলেই বুঝতে পারবেন, এই সংবাদটি প্রকাশিত হলে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে যাবে, সীমান্তে নতুন ধরনের খেলা শুরু হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘জয় বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ লেখা মুদ্রা ঢুকছে অবরুদ্ধ দেশে। এই টাকা বৈধ কি অবৈধ, সেটা সামরিক সরকার জানানোর চেষ্টা করলেও আসল বার্তাটি পেয়ে গেছে স্বাধীনতাকামী মানুষ।
ইত্তেফাক খবরটি ছেপেছিল এইভাবে:
‘জয় বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ চিহ্নযুক্ত নোট অবৈধ’
ইসলামাবাদ, ৭ই জুন—আজ কেন্দ্রীয় সরকারের এক প্রেস নোটে বলা হয়: সরকারের গোচরীভূত হইয়াছে যে, অনুপ্রবেশকারী এবং দুষ্কৃতকারীগণ তাহাদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অংশ হিসাবে ‘জয় বাংলা’ অথবা ‘বাংলাদেশ’ অথবা অনুরূপ কোনো কথা মুদ্রিত করিয়া কিংবা মার্কা দিয়া অথবা ছাপ দিয়া কিংবা এমবোস করিয়া কিংবা সিল দিয়া বিপুল সংখ্যক কারেন্সি নোট বাচারে ছাড়িয়াছে।
জনসাধারণকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হইতেছে যে, এই ধরনের নোট বৈধ মুদ্রা নহে এবং এইগুললির আদৌ কোনো মুর্য ননাই।
১৯৭১ সালের ৭ই জুনের ৮১ নং সামরিক আইনবিধি অনুসারে কোনো লোক যে কোনো ভাষায় অথবা কোনোভাবে এই ধরনের চিহ্ন সম্বলিত কোনো কারেন্সি নোটের মূল্য পাকিস্তান স্টেটব্যাংক অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট হইতে দাবী অথবা গ্রহণ করিতে পারিবে না।
(ইত্তেফাক, ৮ জুন, ১৯৭১)
সত্যিই যে বাংলাদেশ জেগে উঠছে, তার আভাস পাওয়া যায় ২১ জুনের ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামে ছাপা হওয়া এক খবরে। খবরটি লেখা হয়েছে খুবই রসঘন করে। কিন্তু তাতে ষ্পষ্ট হয়েছে, করাচীর খালও বাংলাদেশি মুদ্রা থেকে মুক্ত নয়।
খবরটির শিরোনাম ছিল ‘করাচীর খালে বাংলা দেশ মুদ্রিত কারেন্সি নোট
করাচী, ১১ জুন (পিপিআই)—গত বুধবার সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট উইমেন কলেজের নিকটে নুন্নাহ খালে ‘বাংলা দেশ’ মুদ্রিত খণ্ড-বিখণ্ড ৫০০ ও ১০০ টাকার বহু কারেন্সি নোট ভাসিতে দেখা গেলে ফ্রেয়ার রোড এলাকায় দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
ইহা দেখিয়া বহুসংখ্যক কিশোর ও বয়স্ক লোক নুন্নাহ খালে ঝাপাইয়া পড়ে। ইহাদের অনেকে নোটের ছিন্ন অংশসমূহ সংগ্রহ করিতে সক্ষম হয় এবং অনেকে আবার ইহাও দাবি করে যে, তাহারা ৫০০ টাকার গোটা নোটও ভাসিয়া যাইতে দেখিয়াছে।
এই খবর ছড়াইয়া পড়িলে হাজার হাজার লোক নুন্নাহর পাড়ে আসিয়া জমা হয় এবং অত্যুৎসাহী কিশোরদের নোট সংগ্রহ অভিযান প্রত্যক্ষ করে। এ ব্যাপারে মনে করা হইতেছে যে, কেহ হয়ত পুলিশের হাতে ধরা পড়িবার ভয়ে তাহার নোটগুলি খালে ফেলিয়া দিয়াছে।
‘ইত্তেফাক, ১২ জুন, ১৯৭১)
পাকিস্তানি সামরিক সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু সংবাদ ছাপার ব্যাপারে। এ ব্যাপারে আমরা আগেই জানিয়েছি। এ রকম এক অবস্থায় আন্তর্জাতিক সংবাদকে তো ফেলা যায় না। আন্তর্জাতিক সংবাদে এমন কিছু থাকে, যা পাকিস্তান সরকারের জন্য খুব সুখকর নয়। সে রকমই একটি সংবাদ লুফে নিয়েছিল ইত্তেফাক। প্রথম পাতার অষ্টম কলামে নিরীহভাবে ছেপেছিল তা। কিন্তু যা বোঝার তা বুঝে নিয়েছে পাঠক মহল।
পাকিস্তানি বর্বরতার কথা ঠিকভাবে জানতে পারছে না পৃথিবী। গণহত্যার ভয়ে কত মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে ভারতে, তা-ও থাকছে অজানা। এ রকম একটি সময়ে জুলাই মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসে একটা খবর ছাপা হলো। সে সংবাদেই জানা গেল ‘পদ্মা’ নামের এক পাকিস্তানি জাহাজ এসে ভিড়বে বাল্টিমোর সমুদ্রবন্দরে।
খবরটি পেয়ে বাল্টিমোর ও পেনসিলভানিয়ায় বসবাসরত একদল সাহসী মার্কিন নাগরিক এই জাহাজ অবরোধের ডাক দেন। এই জাহাজে করে অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হবে, সেই অস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করা হবে—এই কথা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর জাহাজটাকে বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হবে না বলে প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন প্রতিবাদকারীরা। তাদের এই প্রতিবাদ নজরে পড়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের। মার্কিন সরকারের চতুর কূটনীতির এ ছিল এক মোক্ষম প্রতিবাদ। এই মানুষেরা প্রচার করেন, মার্কিন সরকার এই গণহত্যার সহযোগী। ফলে, বাল্টিমোর বন্দরে পাকিস্তানি জাহাজ ভেড়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। ছোট ছোট ডিঙি দিয়ে ঘিরে রাখা হয় পদ্মা নামের জাহাজটি। এই নাগরিকেরা জোরালো ভাষায় অস্ত্র দিয়ে বাঙালি হত্যার প্রতিবাদ করতে থাকেন। কোয়েকার বলে শান্তিবাদী খ্রিস্টানদের একটি গোত্র এই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিল। শান্তি ও মানবতার পক্ষে ছিল তাদের অবস্থান।
এই বিষয়টি শুরুতে চেপে রাখার চেষ্টা করেছিল মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু পরে তা আর গোপন থাকেনি। অগত্যা এক মার্কিন মুখপাত্র ঘটনাটি শিকার করতে বাধ্য হয়। ইত্তেফাকে সংবাদটি এভাবে প্রকাশিত হয়েছিল:
মার্কিন মুখপাত্রের স্বীকারোক্তি
পদ্মায় সমর সম্ভার বোঝাই করিতে ডকারদের অসম্মতি
ওয়াশিংটন, ১৬ই জুলাই (এপিপি/রয়টার)—পররাষ্ট্র দফতরের জনৈক মুখপাত্র স্বীকার করেন যে, বর্তমানে বাল্টিমোরে নোঙ্গরকৃত ৮৮৫৫ টনের পাকিস্তানি মালবাহী জাহাজ পদ্মায় মাল বোঝাই করিতে ডাক শ্রমিকরা অস্বীকার করিয়াছেন। এই জাহাজে পাকিস্তানের জন্য অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই করার কথা ছিল। আন্তর্জাতিক লং শোরমেন এসোসিয়েশনের সভাপতি ডকারদের করাচীভিত্তিক উক্ত জাহাজে মাল বোঝাই করিতে নিষেধ করিয়া দিয়াছেন। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিতে উক্ত ইউনিয়ন নিরপেক্ষতা অবলম্বন করার প্রেক্ষিতে ডকারদের মাল বোঝাই করিতে নিষেধ করা হইয়াছে। বর্তমানে উক্ত জাহাজ অস্ত্রশস্ত্র বহির্ভূত মালপত্র সংগ্রহের চেষ্টায় রহিয়াছে।
পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেন যে, উক্ত জাহাজে বিমানের জন্য স্পেয়ার পার্টস, মিলিটারী ভেহিকলস অ্যান্ড শিপস এবং আর্টিলারীসহ ১২ লক্ষ ৩১ হাজার ৩৮ ডলার মূল্যের সরঞ্জামাদি, ইহাতে ২২ ক্যালিবর এবং ২২০০০ রাউন্ড অস্ত্রশস্ত্রও রহিয়াছে।
তিনি আরও বলেন যে, দি ফিলাডেলফিয়ার ফ্রেন্ডস অব ইস্টবেঙ্গল-এর বিক্ষোভকারীরা গত বুধবারে উক্ক মালবাহী জাহাজকে একটি অননুমোদিত সংবাদের উপর ভিত্তি করিয়া মালবোঝাই হইতে বিরত রাখার চেষ্টা করে। উহাতে পাকিস্তানের জন্য নিষিদ্ধ মিলিটারী সরঞ্জাম বহন করার খবর প্রচারিত হয়।
(ইত্তেফাক, ১৭ জুলাই, ১৯৭১)
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-৯
মোনায়েম খানের কথা অনেকেরই মনে পড়ে যাবে। ‘আইয়ুব-মোনেম ভাই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই’ ছিল এক সময়ের জনপ্রিয় শ্লোগান। সেই মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর অবসর জীবনপযাপন করছিলেন বনানীতে সদ্যনির্মিত বাড়িতে। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আততায়ীর হাতে নিহত হন তিনি।
পূর্ব পাকিস্তানকে যেভাবে শোষণ করা হচ্ছিল, তাতে আইয়ুবের পাশাপাশি মোনায়েম খানেরও হাত ছিল। ফলে আন্দোলনরত বঙ্গবাসীরা মোনায়েম খানের প্রতিও ক্ষুব্ধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মোনায়েম খানকে হত্যা করার ঘটনা যুদ্ধকে চাঙ্গা করতে অবদান রেখেছিল। খবরটি কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল অবরুদ্ধ বাংলাদেশে, সেটা দেখা যাক। দৈনিক বাংলায় লেখা হয়েছিল এভাবে:
মোনেম খান গুলিতে নিহত
স্টাফ রিপোর্টার
হাসপাতাল সূত্রে জানান হয়েছে যে, আজ বৃহস্পতিবার ভোর ০৩.৪৫ মিনিটে জনাব
মোনেম খান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি………….. রাজিউন)
পূর্ববতী খবরে প্রকাশ
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জনাব আব্দুল মোনেম খান তার বনানীস্থ বাসভবনে আততায়ীর গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। গভীর রাতে এপিপি পরিবেশিত খবরে হাসপাতাল কর্তৃক বলা হয় যে, জনাব মোনেম খানের অবস্থা গুরুতর।
পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে উক্ত খবরে আরো বলা হয় যে দুজন দুষ্কৃতিকারী জনাব মোনেম খানের উপর গুলি চালায়। পুলিশ জানায় যে জনাব মোনেম খানের বাসভবনের নীচের তলায় একটি হাত বোমাও
পাওয়া গেছে।
গতকাল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জনাব মোনেম খানের জামাতা জনাব জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল ঘটনার বিবরণ দিয়ে আমাকে জানান যে গতকাল মাগরেব নামাজের পর জনাব আব্দুল মোনেম খান তার বনানীস্থ বাসভবনের ড্রইং রুমে আসেন। সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যে সাবেক প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী জনাব আমজাদ হোসেন ও অপর কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা অপেক্ষা করছিলেন। জনাব জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলও তখন বৈঠকখানায় ছিলেন। তারা যখন আলাপ-আলোচনা করছিলেন তখন ড্রইংরুমের দরজা খোলা ছিল এবং বারান্দায় বাতি নেভানো ছিল। এই সময়ে দরজার দিক থেকে কে বা কাহারা জনাব মোনেম খানকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলি তার পেটে বিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
তার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলি ছুড়ে আততায়ী অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়। ড্রইং রুমের অন্যান্যরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৭ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে কেবিনে স্থানান্তরিত করা হয়।
পরে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে যে, জনাব মোনেম খানের শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়ে বের হয়ে গেছে। তার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। জনাব মোনেম খানের আহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে তার আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধব হাসপাতালে তাকে দেখতে যান।
(দৈনিক পাকিস্তান, ১৪ অক্টোবর ১৯৭১)
খবরটি দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হয় এভাবে:
মোনেম খান গুলিতে নিহত
স্টাফ রিপোর্টার
হাসপাতাল সূত্রে জানান হয়েছে যে, আজ বৃহস্পতিবার ভোর ০৩.৪৫ মিনিটে জনাব
মোনেম খান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি………….. রাজিউন)
পূর্ববতী খবরে প্রকাশ
গতকাল (বুধবার) রাত্রে পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গবর্নর জনাব আবদুল মোনেম খান অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির গুলিতে গুরুতর আহত হইয়াছেন। তাঁহার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন বলিয়া গতকল্য অধিক রাত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়াছে।
সাবেক গবর্ণরের তলপেটের বাম দিকে গুলীবিদ্ধ হইয়াছে। আততায়ীরা জনাব আবদুল মোনেম খানের বনানীস্থ নবনির্মিত বাসভবনের বৈঠকখানায় ঢুকিয়া তাঁহাকে গুলী করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ১৯৬৯ সালে গবর্নর পদ হইতে অবসর লাভের পর জনাব মোনেম খান তাঁহার বনানীস্থ বাসভবনে অবসর জীবন যাপন করিতেছেন।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, গতকাল সন্ধ্যার পর ২ জন লোক সাবেক গবর্নর জনাব আবদুল মোনেম খানের সহিত সাক্ষাতের জন্য বনানীতে তাঁহার বাসভবনে যান। বৈঠকখানার কামরায় বসিয়া কথাবার্তা বলার মাঝখানে তাহারা সাবেক গবর্নর জনাব মোনেম খানের প্রতি গুলিবর্ষণ করে। গুলী তাঁহার তলপেটে বিদ্ধ হয়। তাঁহাকে গুলীবিদ্ধ করিয়া দুষ্কৃতকারীরা পলায়ন করিতে সক্ষম হয় বলিয়া পুলিশ সূত্রে জানা যায়। সাবেক গবর্নরের বাসভবনের নীচ তলায় একটি কামরা হইতে হাতবোমা উদ্ধার করা হয় বলিয়া এপিপি পরিবেশিত খবরে বলা হয়।
গুলীবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুমানিক রাত ৮টায় সাবেক গবর্নর জনাব আবদুল মোনেম খানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে ত্বরিত এক্সরে ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা মেডিকল কলেজ হাসপাতালের সার্জিকাল প্রফেসরগণ তাঁহার জীবন রক্ষার জন্য কয়েক ঘণ্টাব্যপী অস্ত্রোপচার চালান এবং রাত ২টায় এই রিপোর্ট লেখার সময়ও অস্ত্রোপচার চলিতে থাকে।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ অক্টোবর, ১৯৭১)
একই খবর দুটি পত্রিকা ২ রকম ট্রিটমেন্টে প্রকাশ করে। ইত্তেফাক শুধু তথ্য তুলে ধরেছে। মোনেম খানের ব্যাপারে বড় কোনো আগ্রহ তাতে প্রতিফলিত হয়নি। দৈনিক বাংলার রিপোর্টে মোনেম খানের প্রতি তাদের এক ধরনের সহানুভূতির প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাদের আত্মীয়দের বর্ণনা, ঘটনার সময়কার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে বিস্তারিতভাবে।
মোনেম খানকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন মোজাম্মেল হক। তাঁর বয়স তখন চৌদ্দ বছর। পড়তেন নবম শ্রেণীতে। মেলাঘরে ট্রেনিং নিয়েছেন তিনি। এই দুঃসাহসী কাজটি করার জন্য মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক উপাধীতে ভূষিত হন।
মোনেম খান হত্যার খবর যখন যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছালো, তখন তারা তাতে অনুপ্রাণিত হলেন। অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর মনে ঢুকল ভয়। গেরিলা বাহিনী বিভিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অতর্কিক আক্রমণ চালাচ্ছিল, তাতে ধীরে ধীরে তারা বেসামাল হয়ে পড়ছিল।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-১০
যুদ্ধ চলাকালে সংবাদপত্রে সেন্সরশিপ আরোপ ও তার মধ্যে কাজ করা নিয়ে একটু কথা বলে নেওয়া যাক।
অবরুদ্ধ বাংলার জীবন ছিল বিচিত্র। দু ধরনের মনোভঙ্গী গড়ে উঠেছিল সে সময়ের নাগরিকদের মধ্যে। একটি হলো, প্রতি মুহূর্তে ছিল অনিশ্চয়তা। কখন পাকিসন্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হতে হবে কিংবা নিহত হতে হবে, তা ছিল অজানা। অন্যটি হলো, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও গোপন প্রতিরোধের খবর পেয়ে মনে আশার প্রদীপ জ্বেলে আলোকিত ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করা।
সংবাদপত্রগুলোর ওপর যে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল, তা পাঠকের জন্য প্রকৃত সংবাদ খুঁজে নেওয়াকে কঠিন করে তুলেছিল। আগেই বলেছি ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেসন্স বা আইএসপিআরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর সিদ্দিক সালিক। তবে এর সর্বোচ্চ কর্তা ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। যিনি অপারেশন সার্চলাইটের সময় ঢাকার হত্যাযজ্ঞে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর টিক্কা খানের বদলে ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিক যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তার আগ পর্যন্ত ৭৭ নং সামরিক বিধির মাধ্যমে সংবাদপত্র প্রকাশ করা হতো। ১ সেপ্টেম্বর ৮৯ নম্বর সামরিক বিধি জারি হয়। স্বাধীনতার আগ পর্যণ্ত এই বিধমতেই সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো।
সরকারি গণমাধ্যম এপিপি পরিবেশিত সংবাদ ও প্রতিবেদন ছাদা বাকি সবকিছুই ছিল সেন্সরশিপের আওতায়। সংবাদপত্রে কোন বিষয়টি প্রকাশিত হচ্ছে, তার প্রতিটি আইটেম লকবুকে এন্ট্রি করতে হতো। কোনটি অনুমোদিত এবং কোনটি বাতিল তা উল্লেখ করা হতো। অনুমোদিত হলে ‘পাস্ড’ বা ‘ইয়েস’ সিল দেওয়া হতো। বাতিল হলে সে সংবাদে সিল দেওয়া হতো ‘নো’।
২৬ মার্চ যখন সামরিক বিধি জারি হয়, তখন পত্রিকাগুলো প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়। শুরুতে যে পত্রিকাগুলো প্রকাশের অনুমতি পায়, সেগুলো ছিল পাকিস্তানপন্থি। যেমন হামিদুল হক চৌধুরীর মালিকানায় প্রকাশিত অবজারভার ও পূর্বদেশ পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে ২৯ মার্চ থেকে। ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান প্রকাশিত হয় ৩০ মার্চ থেকে। আরো কিছু পত্রিকা এপ্রিলে প্রকাশ পেতে শুরু করলেও দ্য পিপল ও দৈনিক সংবাদ এ সময় আর প্রকাশিত হয়নি। জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম ছিল পাকিস্তান সরকারের খুবই আস্থাভাজন। সেন্সরশিপের কারণে অন্যান্য পত্রিকায় বহু সংবাদ ‘নো’ তকমা পেলেও দৈনিক সংগ্রামের জন্য ‘ইয়েস’ই ছিল বেশি।
সে সময় সংবাদপত্রে কর্তৃপক্ষের তৈরি করা সংবাদও ছাপতে হতো। এগুলোর সূত্র ছিল সরকারি গণমাধ্যম এপিপি। রয়টার্সের সংবাদও কিছু কিছু ছাপা হতো।
সরকার সংবাদপত্রকে যে পরামর্শ দিত, সেটাও এখানে উল্লেখ করা যায়। সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোরশেদ তাঁর ‘অবরুদ্ধ সংবাদপত্র ৭১ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর রণনীতি ও রণকৌশল’ নামের বইয়ে লিখেছেন,
১৩ জুলাই ১৯৭১
১. কাউকে চাবকানো হচ্ছে অথবা ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছেএ ধরনের ভীতি উদ্রেককারী কোনো ছবি তা দেশি হোক কিংবা বিদেশি হোক, পত্রিকায় ছাপা যাবে না।
২. বিক্ষোরণের খবর ছাপা যাবে না। কোনো ছবি যাবে না। সরকার প্রদত্ত খবর ও ছবি ছাড়া (যদি প্রদান করা হয়) এ সম্পর্কে অন্য কোনো খবর বা ছবি ছাপা যাবে না। এ ব্যাপারে পরবর্তী পর্যায়ে আরো বিস্তৃত ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য জানানো হবে।
৩. আগে তথাকথিত লিখলেও এখন থেকে নিম্নলিখিত শব্দগুলো লেখা যাবে না—মুক্তিফৌজ, মুক্তিবাহিনী, গণবাহিনী, বাংলাদেশ, জয় বাংলা।’
৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
১. শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর বাবা-মা, তাঁর পরিবার সম্পর্কে কোনো খবর ছাপা যাবে না।
২. ‘বাংলাদেশ’ হেডিং-এ ব্যবহার করা যাবে না।
৩. ‘মুক্তি ফৌজ’ বা ‘মুক্তিবাহিনী’ শব্দগুলো ব্যবহার করা যাবে না। এগুলো বদলে ‘বিদ্রোহী’ অথবা ‘ভারতীয় এজেন্ট’ ব্যবহার করতে হবে।
৪ নভেম্বর ১৯৭১
বিস্ফোরণের খবর প্লেডাউন করতে হবে অর্থাৎ প্রমিনেন্ট করে দেওয়া যাবে না।
আমরা পর্যায়ক্রমে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো এড়িয়ে কীভাবে সংবাদ প্রকাশ করা হতো অবরুদ্ধ বাংলায়, সে কথাগুলো বলব।
দৈনিক ইত্তেফাক থেকে ১২ আগস্ট প্রকাশিত দুটি ছোট সংবাদ এখানে তুলে দিলে বোঝা যাবে, কেন খবরগুলো এভাবে ছাপা হয়েছিল।
সেদিন ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় মাঝামাঝি ছাপা হয়েছিল এই খবরটি:
ভারতীয় এজেন্টদের গুলীতে মওলানা মুস্তফা আল মাদানী নিহত’
গতকাল (বুধবার) এপিপি পরিবেশিত এক খবরে প্রকাশ, বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা ও পূর্ব পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টির সহ-সভাপতি মওলানা সৈয়দ মাহমুদ মোস্তফা আল মাদানী গত ১০ই আগস্ট রাত্রি ৮টায় ঢাকা জেলার মীর কাদিমের নিকটবর্তী আবদুল্লাপুরে এক সমাবেশে বক্তৃতাকালে ভারতীয় এজেন্টদের গুলীতে নিহত হন (ইন্না…রাজেউন)।
আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টায় বায়তুল মোকাররমে মরহুমের নামাজে জানাজায় শরীক হওয়ার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান হইয়াছে।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ আগস্ট, ১৯৭১)
‘ভারতীয় এজেন্ট’ বলতে যে মুক্তিবাহিনীর কথা বলা হচ্ছে, সেটা সংবাদপত্রের প্রতি সামরিক সরকারের পরামর্শগুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
সেদিনই ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রথম কলামের শেষ সংবাদটি ছিল মাত্র কয়েক লাইনের।
‘ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিস্ফোরণ, তিনজন বিদেশী আহত
এপিপি পরিবেশিত খবরে প্রকাশ, গতকাল (বুধবার) বিকালে ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ল্যাভেটরিতে তিনটি বিস্ফোরণের ফলে তিনজন বিদেশী আহত হয় বলিয়া জানা গিয়াছে।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ আগস্ট, ১৯৭১)
এই সংবাদটি দেশের বাইরের সংবাদপত্রগুলোয় কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, সে আলোচনা হবে এবার।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-১১
আমরা আগেই দেখেছি, বিস্ফোরণের সংবাদগুলো যেন পত্রিকায় অগুরুত্বপূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়, তার নির্দেশ দিয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক সরকার। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলো থেকেই জানা যাচ্ছিল, ঢাকা শহরে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে।
২৫ সেপ্টেম্বর প্রাদেশিক মৌলিক গণতন্ত্র, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন দফতরের মন্ত্রী মওলানা মোহাম্মদ ইসহাক তার গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে আহত হন। দৈনিক পাকিস্তান তখন পাকিস্তান সরকার নির্দেশিত পথেই চলছিল। তারা তাদের রিপোর্টটি ছাপে এভাবে:
গাড়িতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে মন্ত্রী আহত
স্টাফ রিপোর্টার
প্রাদেশিক মৌলিক গণতন্ত্র, স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন দফতরের মন্ত্রী মওলানা মোহাম্মদ ইসহাক গতকাল শনিবার তার গাড়ির মধ্যে রক্ষিত মেয়াদী বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। হাসপাতালে এখন তাঁর অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি ঘটছে।
তাঁর গাড়ির ড্রাইভার সাজ্জাদও আহত হয়েছে। …ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী মহোদয়ের ডান পা ও ডান বাহুতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনি হাসপাতালের নয় নম্বর নিউ কেবিনে রয়েছেন। গাড়ির ড্রাইভার সাজ্জাদের দেহেও অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
গতকাল বেলা পৌণে একটা থেকে একটার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চৌরাস্তায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রাদেশিক নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক মওলানা আশরাফ আলী এই প্রতিনিধিকে টেলিফোনে জানান যে, মন্ত্রী মহোদয় লালবাগে নেজামে ইসলাম এর এক কর্মীসভায় যোগদানের পর সেক্রেটারিয়েট ফিরে যাচ্ছিলেন।
তিনি জানান যে মেয়াদী বোমাটা গাড়ীর ডানপার্শ্বস্থ আসনের নীচে রক্ষিত ছিল। মন্ত্রী মহোদয় গাড়ীর পেছনের আসনে ডানপার্শ্বে ছিলেন।…
(দৈনিক পাকিস্তান, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)
ইত্তেফাক কিন্তু রিপোর্টটি শুরুই করেছিল এপিপি’র বরাত দিয়ে। কারণ এপিপির যে কোন খবর ছাপা মানেই এটা সরকারি ভাষ্য। তারা শিরোনাম করেছিল:
মেয়াদী বোমা বিস্ফোরণে প্রাদেশিক মন্ত্রী আহত
এপিপি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের মৌলিক গণতন্ত্র ও স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী মওলানা মোহাম্মদ ইসহাত গতকাল (শনিবার) বোমা বিস্ফোরণে সামান্য আহত হন। তাঁহার মোটর গাড়ীতে একটি মেয়াদী বোমা রাখা হইয়াছিল বলিয়া মনে করা হইতেছে। মন্ত্রী মহোদয় ডান হাত ও ডান পায়ে আঘাত পাইয়াছেন। মন্ত্রী মহোদয়ের মোটর গাড়ীর ড্রাইভারও আহত হইয়াছে।
বিস্তারিত রিপোর্টটি পড়লে বোঝা যায়, মন্ত্রীর গাড়িতে টাইম বোমা রাখা হয়েছিল। খবরটি কীভাবে দেশের বাইরে ছাপা হয়েছিল, তারও একটা নমুনা থাকা চাই। ২৬ সেপ্টেম্বরের অগ্রদূত পত্রিকায় খবরটি ছাপা হয়েছিল কীভাবে, তা দেখুন:
মন্ত্রীর এক হাত ও এক পা
রৌমারী।। ২৪শে সেপ্টেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার পরিবেশিত সংবাদে প্রকাশ বাংলার অধিকৃত অঞ্চলে খুনি ইয়াহিয়ার মনোনীত মন্ত্রীসভার সদস্য মৌলানা মহম্মদ ইসাকের মটর গাড়ীতে আমাদের দুর্বার গেরিলাগণ টাইমবোমা গোপনে রেখেছিলেন। এই বোমা বিস্ফোরণের ফলে নব মনোনীত মন্ত্রী সাহেবের এক হাত ও এক পা ওফাত বরণ করেছে। ঢাকা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে বঙ্গবৈরি মন্ত্রী সাহেব তার কৃতকর্মের ফলাফলের যোগ বিয়োগ করছেন আর বাকী মন্ত্রী সাহেবরা তো ‘এখন কি করি কি করি’ করে অস্থির হয়ে উঠেছেন।
(অগ্রদূত, ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)
এইদিনই ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় শেখ মুজিবুর রহমানের পিতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি ছাপা হয়েছিল এভাবে:
শেখ মুজিবের অশীতিপর পিতাও হাসপাতালে নীত
ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শেখ মুজিবুর রহমানের পিতা-মাতার অবস্থা গতকাল (শনিবার) অপরিবর্তিত ছিল বলিয়া পিপিআই পরিবেশিত খবরে বলা হইয়াছে।
৭৫ বৎসর বয়স্কা শেখ মুজিবর রহমানের মাতা হাঁপানি ও ব্রংকাইটিস রোগে ভুগিতেছেন। কয়েকদিন পূর্বে তাঁহাকে উক্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের ৯০ বৎসর বয়সী পিতাকেও গত শুক্রবার একই হাসপাতালে ভর্তি করা হইয়াছে। তিনি গ্যাস্ট্রিক, আলসার, রক্তশূন্যতা ও চক্ষুপীড়ায় ভুগিতেছেন।
গতকাল তাঁহাদের অবস্থার কোনোরূপ উন্নতি কিংবা অবনতি ঘটে নাই।
এবার একটু পিছনদিকে তাকাই। আওয়ামী লীগকে দমন করার নানা চেষ্টাই তখন করে যাচ্ছিল সামরিক সরকার। জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি সংবাদ ছিল এ রকম
তাজউদ্দিন ও অন্যান্যদের ফৌজদারি আদালতেও বিচার হবে
সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের নিকট হাজির হতে ব্যর্থ হওয়ার দরুণ ৪০ নম্বর সামরিক আইন বিধির অধীনে ঢাকার সাত মসজিদ রোডের জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, বাকেরগঞ্জ জেলার বোয়ালিয়ার জনাব তোফায়েল আহমদ, ময়মনসিংহ জেলার রাঙ্গল শিমুলের জনাব এ এম নজরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার ১১০ নম্বর সিদ্ধেশ্বরীর জনাব আবিদুর রহমানকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের সম্পত্তির শতকরা ৫০ ভাগ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে আনীত প্রধান প্রধান অভিযোগের জন্য পরে ১২১ নম্বর পাকিস্তান দণ্ডবিধি অর্থাৎ ৫ নম্বর সামরিক আইন বিধির অধীনে তাদের বিচার করা হবে বলে গতকাল বুধবার এপিপি পরিবেশিত খবরে প্রকাশ।
(দৈনিক সংগ্রাম, ১১ জুন, ১৯৭১)
একই সংবাদ দৈনিক ইত্তেফাক একই ভাবে ছেপেছে। শুধু একটি শব্দের ব্যবহার পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। সংগ্রাম লিখেছে ’ সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের নিকট হাজির হতে ব্যর্থ হওয়ার দরুণ’ অর্থাৎ দোষটা চাপানো হয়েছে তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের ওপর। সেখানে ইত্তেফাক লিখেছে, ‘সামরিক কর্তৃপক্ষের সম্মুখে হাজির না হওয়ায়’। পরিবেশনের ঢংয়েই বোঝা যায় দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য।
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনটি এ রকম:
তাজুদ্দীন প্রমুখের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মূল মামলার বিচার পরে হইবে
‘সামরিক কর্তৃপক্ষের সম্মুখে হাজির না হওয়ার জন্য ৪০ নম্বর সামরিক আইনবিধি অনুযায়ী তাজউদ্দীন আহমদ, সাতমসজিদ রোড, ঢাকা, তোয়ায়েল আহমদ, পোঃ কোড়ালিয়া, জেলা বাকেরগঞ্জ, এ এম নজরুল ইসলাম, লাঙ্গলশিমাল, জেলা ময়মনসিংহ, আবদুল মান্নান, ১১০ সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা এবং পিপল-এর মালিক ও ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসিন্দা আবিদুর রহমান—এই সকল ব্যক্তিকে ১৪ বৎসর করিয়া সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হইয়াছে এবং তাহাদের সম্পত্তির শতকরা ৫০ ভাগ বাজেয়াফত করা হইয়াছে বলিয়া গত বুধবার ঢাকায় এপিপি পরিবেশিত এক খবরে বলা হয়।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-১২
সামরিক সরকার বোঝেওনি, তাদের পরামর্শগুলো হাস্যকর। জুলাই থেকেই ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় চলছিল বোমা হামলা। ভীত পাকিস্তানি বাহিনীকে নৈতিক সাহায্য দেওয়ার জন্য রাজাকার কিংবা শান্তি কমিটির লোকেরা থাকত বটে, কিন্তু তাদের অবস্থাও পাকিস্তানি হানাদারদের চেয়ে কোনো অংশে ভালো ছিল না।
ডিসেম্বরে এক আজব নির্দেশ পেয়েছিল থানার অফিস ইনচার্জরা। পিটুনিকর নামের সেই কর বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে। তার আগে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হেনস্তা হওয়া সামরিক কর্তৃপক্ষ কী নির্দেশ দিয়েছিল, সেটাও দেখে নেওয়া দরকার।
সরকারের সিদ্ধান্ত
দুষ্কৃতিকারী গ্রেফতার বা খবরের জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে
যে সব অনুগত ব্যক্তি দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেফতারের মতো নির্ভরযোগ্য খবর দেবে বা নিজেরা দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেফতার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের কাছে পেশ করবে সরকার তাদের যথোপযুক্ত পুরস্কার দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে গতকাল বুধবারএক প্রেসনোটে জানানো হয়েছে।
এপিপির খবরে প্রকাশ, পুরস্কারের হার নিম্নরূপ:-
দুষ্কৃতিকারী গ্রেফতার অথবা দুষ্কৃতিকারীদের সাথে সফল মোকাবিলার জন্য খবর দেওয়ার জন্যে ৫০০.০০ টাকা।
ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত দুষ্কৃতিকারী গ্রেফতারের জন্য ৭৫০.০০ টাকা।
রাইফেল, বোমা বা ডুপ্লিকেটিং মেশিন বা অপরাধ করা যায় এমন অন্য কোন আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতারের জন্য ১০০০.০০ টাকা।
দুষ্কৃতিকারী দলের নেতা গ্রেফতারের জন্য ২০০০.০০ টাকা।
বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার অথবা দুষ্কৃতিকারীদলের নেতা গ্রেফতারের জন্য দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বড় অঙ্কের পুরস্কার দেবার বিষয় বিবেচিত হতে পারে।
জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট এক হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার মঞ্জুর করতে পারবেন।
দুষ্কৃতিকারীদের শ্রেণী বিভাগ নিম্নরূপ হবে:
তথাকথিত মুক্তি বাহিনীর নিয়মিত সদস্য, তথাকথিত মুক্তি বাহিনী ভর্তিতে সাহায্যকারীরা।
স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের খাদ্য, যানবাহন ও অন্যান্য দ্রব্য সরবরাহকারী।
স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের আশ্রয়দানকারী।
বিদ্রোহীদের ‘ইনফরমার’ বা বার্তাবাহক রূপে যারা কাজ করে এবং তথাকথিত মুক্তিবাহিনী সম্পর্কিত নাশকতামূলক লিফলেট, প্যাম্পপেট, প্রভৃতির লেখক বা প্রকাশক।
(দৈনিক পাকিস্তান, ২৫ নভেম্বর ১৯৭১)
এরপরও তো ধ্বংসাত্মক ঘটনা কমছিল না। তখন দেখা গেল নতুন নির্দেশ:
দুষ্কৃতিকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে না ধরিয়ে দিলে
ঘটনার জন্য পিটুনীকর দিতে হবে
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় পিপিআই এর খবরে বলা হয় যে ৬ নম্বর সেক্টরের এসএমএলএ শহরের সবকটি থানার অফিসার ইন চার্জকে নির্দেশ দিয়েছেন যে তারা যেন জনসাধারণকে নির্দেশ দেন যে যখন যেখানে বোমা বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণ, হত্যা, অগিড়বসংযোগ, লুটতরাজ প্রভৃতি ঘটাবে, ঘটনাস্থল থেকে ৫ শত গজের মধ্যে বসবাসকারী জনগণ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হলে তাদেরকে ঘটনার জন্য পিটুনীকর দিতে হবে।
(দৈনিক পাকিস্তান, ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)
অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হলো এই আদেশের মাধ্যমে। অবশ্য ততদিনে পূর্ব আকাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারছিল, এখন তারা যা করছে, তা বজ্র আঁটুনি, ফস্কা গেরো। এখন যে আদেশই দেওয়া হোক না কেন, তাতে আর কাজ হবে না।
৩ ডিসেম্বরের ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় পিটুনি করের রিপোর্টটি ছাড়াও আরও তিনটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যা তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রকাশ করা ছিল কঠিন। একটি হলো নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২ জন পরিষদ সদস্যের বিবৃতি। ইত্তেফাকে ছাপা হওয়া এই বিবৃতিটি ছিল এ রকম:
জনগণ পরাজিত ও প্রত্যাখ্যাতদের নেতৃত্ব মানিয়া লইবে না
করাচী, ২ ডিসেম্বর (পিপিআই)—বেআইনী গোষিত আওয়ামী লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে বহাল সদন্য যথাক্রমে এ বি এম নূরুল ইসলাম ও জনাব এস বি জামান এই মর্মে মত প্রকাশ করেনযে, পাকিস্তানের জনগণ কখনও পরাজিত এবং প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের নেতৃত্ব মানিয়া লইবে না।
গতকল্য এখানকার সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্যরা বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস করার কারণ রহিয়াছে যে তথাকথিত রাজনীতিকরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিতেছে এবং তাহারা পশ্চাৎদ্বার দিয়া ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করিতেছে।
…তাহারা বলেন, ‘আমরা গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করিতেছি যে, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা—যাহারা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক প্রহরা ছাড়া চলাফিরা করিতে পারেন না এবং যাহাদের পিছনে জনসমর্থন নাই—তাহারা এক্ষণে যুদ্ধের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলিতেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সহিত একমত হইয়া আমরা বলিতে চাই যে, যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান করে না বরং সমস্যা বৃদ্ধি করে।
…তাহারা আরও বলেন, ‘আমাদের পশ্চিম পাকিস্তান থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তানের জনৈক দক্ষিণপন্থী প্রবীণ রাজনীতিবিদ এখানে দাবি করিতেছেন যে, বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের কতিপয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের সমর্থন তাহার পক্ষে রহিয়াছে। আমরা ওই ব্যাপারে উক্ত নেতাকে চ্যালেঞ্জ প্রদান করি এবং কথিত সমর্থদের নাম ঘোষণার দাবি জানাই।
তাঁহারা বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের বহাল সদস্যরা পাকিস্তানের অপর কোনো দলে যোগদান করিবেন না। তাহারা বলেন, সরকার আমাদের জানাইয়াছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে আমরা কোনো মন্তব্য করিতে পারিব না। কেননা তিনি বিচারাধীন রহিয়াছেন। অথচ, বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে খান আবদুল কাইয়ুম খান, অধ্যাপক গোলাম আজম, মওলানা আবদুল খালেক এবং অন্য ব্যক্তিরা মধ্যে মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়া চলিয়াছেন।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১)
অন্য সংবাদটি ইন্দিরা গান্ধীর। কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তিনি। সে বক্তৃতায় তিনি যা বলেছিলেন, তা ইত্তেফাকে এভাবে ছাপা হয়েছিল, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাংলা দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমেই শুধু ‘বাংলা দেশ’ সমস্যার সমাধান হইতে পারে। এইরূপ ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ বাস্তুত্যাগী গৃহে ফিরিয়া শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করিতে সক্ষম হইবে বলিয়া তিনি মন্তব্য করেন।’
তৃতীয় সংবাদটি মার্কিন সিনেটর উইলিয়াম সাক্সবির। তিনি এসেছিলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু করতে পারেননি। সেই রিপোর্টটি নিয়েই কথা শুরু হবে কাল।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-১৩
ডিসেম্বর মাসে এসে বোঝা যাচ্ছিল, পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দেওয়া সেন্সরশিপ সেভাবে কাজ করছে না। বহু খবরই তখন প্রকাশিত হচ্ছিল অবরুদ্ধ নগরীর সংবাদপত্রে। ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন কিংবা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিবৃতি একই দিনে প্রকাশিত হলো। সেদিন ইত্তেফাক ‘পিটুনী কর’ বিষয়ক রিপোর্টটির যে শিরোনাম করেছিল, সেটি সাধারণ শিরোনাম ছিল না। চোখ যেন সেদিকে যায়, তা নিশ্চিত করতে বড় ফন্টে ত্রিভূজের মধ্যে করেছিল শিরোনাম।
মার্কিন সিনেটর উইলিয়াম স্যাক্সবি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ইত্তেফাক ছেপেছিল এপিপির পাঠানো সংবাদই। কিন্তু তা থেকে পাঠক জানতে পেরেছিল এ সময়ের বাস্তবতাও।
রিপোর্টটি ছিল এ রকম:
সিনেটর স্যাক্সবী শেখের সহিত দেখা করিতে পারেন নাই
রাওয়ালপিণ্ডি, ২রা ডিসেম্বর (এপিপি)—সফররত মার্কিন সিনেটর মি. উইলয়াম স্যাক্সবী আজ বিকালে এখানে বলিয়াছেন, বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত সাক্ষাতের জন্য তিনি একটি অনুরোধ জানাইয়াছিলন, কিন্তু সাক্ষাৎ করিতে পারেন নাই।
করাচী রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সহিত আলোচনাকালে তিনি বলেন, ‘শেখের নিকট তাঁহার নির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশের মতো কিছু ছিল না। তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বলিোছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত আছেন কিনা তাহা তিনি দেখিতে চান। প্রেসিডেন্ট তাঁহাকে বলেন যে, শেখের স্বাস্থ্য চমৎকার রহিয়াছে। তিনি প্রেসিডেন্টকে জানান যে শেখের মস্তিস্ক শুদ্ধি করা হইযাছে বলিয়া ভারতে বলাবলি করা হইতেছে।
সিনেটর উল্লেখ করেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে এ কথাও বলিয়াছেন যে, শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিলে তিনি পুনরায় এখানে আসিতে রাজি আছেন।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১)
একটু পিছনে ফিরে জুলাই মাসে গেলে দেখা যাবে, পত্রিকায় প্রতীকি ভাষার ব্যবহার। দৈনিক ইত্তেফাক সে কাজটি করেছে জেনেবুঝে। ৮ জুলাই যেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সাজ্জাদ হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. মোহর আলী এক যৌথ বিবৃতি দিলেন, সেদিনকার ইত্তেফাকের নিউজ ট্রিটমেন্টের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যাবে খবরের ভিতরের খবর খুঁজে নেওয়ার জন্য পাঠককে আহ্বান জানানো হচ্ছে। দুই অধ্যাপকের যৌথ বিবৃতির খবরটি আমরা নিচ্ছি দৈনিক পাকিস্তান থেকে:
উপাচার্য ড. সাজ্জাদ হোসেন ও অধ্যাপক ড. এম. মোহর আলী এর যৌথ বিবৃতি
‘‘পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের জীবনের নিরাপত্তা নেই-এ কথা ভিত্তিহীন”
লন্ডন, ৮ জুলাই (রয়টার)। পূর্ব পাকিস্তানের শহর ও গ্রামে বাঙালীদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই বলে যে কথা বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের ২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গতকাল তা অস্বীকার করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. এস. সাজ্জাদ হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রীডার ড. এম. মোহর আলী টাইমস পত্রিকায় লিখিত এক দীর্ঘ চিঠিতে তাঁদের এই অস্বীকৃতির কথা জানান।
‘বিদেশে প্রচারিত নৃশংসতার কাহিনী’ উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই যে এ ধরনের কাহিনী প্রচার অব্যাহত থাকার ফলেই এ রকম সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে যে পূর্ব পাকিস্তানে শহর ও গ্রামে বাঙালীদের বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালীদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই।
বুদ্ধিজীবীদের পাইকারী হত্যা করা হয়েছে বলে যে কাহিনী প্রচারিত হয়েছে, অধ্যাপকদ্বয় তাও অস্বীকার করেছেন। চিঠিতে বলা হয় যে, মার্চের ২৫/২৬ তারিখে জগন্নাথ ও ইকবাল হলের আশেপাশের এলাকায় যুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।
চিঠিতে বলা হয় যে, আমাদের ৩ জন সহযোগী প্রাণ হারাতেন না, যদি না তাঁরা যে ভবনগুলোতে বাস করতেন, সেগুলোকে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতো।
(দৈনিক পাকিস্তান, ৯ জুলাই ১৯৭১)
একই দিনে ইত্তেফাক এই সংবাদটির শিরোনাম করে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ৯জন শিক্ষক প্রাণ হারান, ড. সাজ্জাত হোসেন ও ড. মোহর আলী কর্তৃক হীন প্রচারণার প্রতিবাদ’। ‘মাত্র’ শব্দটির মধ্যে যে বিদ্রুপ আছে, সেটা সচেতন পাঠকের চোখে পড়বে।
সেদিনই ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল
‘ইয়াহিয়া-কিসিংগার বৈঠক আরম্ভ/বাস্তুত্যাগী সমস্যা ও উপমহাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকিন্তানী অফিসারদের সঙ্গে নিক্সন সহকারীর আলোচনা’
এই প্রতিবেদনের ঠিক নিচেই ছাপা হয়েছে আরেকটি শিরোনাম:
ইসরাইলের ঘনবসতি এলাকায়/গেরিলাদের রকেট হামলা
ইংগিতটি পরিষ্কার। মুক্তিযোদ্ধারা যে এ সময় অবরুদ্ধ দেশে হামলা চালানো শুরু করেছে, তারই একটা আভাস দিয়ে দেওয়া হলো এই প্রতিবেদনে। ইয়াহিয়া-কিসিংগারের আলোচনার খবর জানার পাশাপাশি এটাও জানতে হবে যে, গেরিলা বাহিনী কিন্তু সক্রিয় রয়েছে।
শুধু কি তাই? শেষের পাতার ৬ষ্ঠ কলামে যখন ইয়াহিয়া-কিসিংগারের খবর জাম্প হয়েছে, তার দুই পাশে দুটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। বাঁ দিকের খবরের শিরোনাম:
থাইল্যান্ডে গেরিলা আক্রমণে ৭ জন সৈন্য নিহত
সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত মঙ্গলবার দক্ষিণ থাইল্যান্ডের থাওসেইয়ান ক্যাম্পের নিকট কম্যুনিস্ট গেরিলাদের অতর্কিত আক্রমণে ৭ জন থাই সৈন্য নিহত ও ১৬ জন আহত হয়।
গত এক বৎসরের মধ্যে উক্ত এলাকায় এত সংঘর্ষ আর কখনও ঘটে নাই। ওয়াকিবহাল মহল বলেন, প্রায় ২০ জন কম্যুনিস্ট গেরিলা মেশিন গান ও হাতবোমা লইয়া একখানি সামিরক ট্রাকের উপর হামলা চালায়। মালয়েশীয় সীমান্তের নিকট সৈন্য পৌঁছানোর জন্য ট্রাকটি ব্যবহৃত হইতেছিল।’
এখানেও ইংগিত পরিষ্কার। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, তখন থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছিল। বোমা হামলা যারা করছিল, তাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ কিংবা ‘ভারতীয় এজেন্ট’ নামে ডাকা হলেও তারা যে মুক্তিযোদ্ধা ছিল, সে কথা সে সময়ের পাঠকেরাও বুঝতে পারত।
ইয়াহিয়া-কিসিংগারের প্রতিবেদনটির ডানপাশেও ছিল আরেকটি ইংগিতময় খবর। শিরোনাম:
ঐক্যই হইল চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পূর্বশর্ত/প্যালেস্টাইন আন্দোলনের দুর্বলতা সম্পর্কে আনোয়ার সাদত।
আকলমন্দকে লিয়ে ইশারায়ি কাফি হ্যায়।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-১৪
নভেম্বর মাসে ঢাকা শহরের অবস্থা কতোটা অরক্ষিত ছিল, সেটা বোঝা যাবে ১১ নভেম্বর প্রকাশিত একটি সংবাদে। সংক্ষেপে সে খবরটি এ রকম:
রোকেয়া হলে ডাকাতি
গত মঙ্গলবার দিবাগত শেষ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে এক মারাত্মক ডাকাতি সংঘটিত হয়। দুষ্কৃতিকারীরা হলের প্রভোষ্ট ও হলে অবস্থানকারী ছাত্রীদের হাজার হাজার টাকার মূল্যবান জিনিসপত্র লইয়া উধাও হয়।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ রাত প্রায় সোয়া দুইটার সময় আনুমানিক ৬০-৭০ জন দুষ্কৃতিকারী রিভলবার, লোহার রড ও অনেক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া জোরপূর্বক রোকেয়া হলে প্রবেশ করে। তারপর তাহারা গেটে প্রহরারত ৪/৫ জন দারোয়ানকে বেদম প্রহার করে এবং তাহাদের বাঁধিয়া ফেলে। তাহারা হলের টেলিফোনের তার কাটিয়া ফেলে ও বিজলী বাতির মেইন সুইচ অফ করিয়া দেয়। অতঃপর দুষ্কৃতিকারীরা
দুষ্কর্ম সাধনের জন্য ছাত্রীদের হোস্টেলের দিকে ধাবিত হয়। একতলা হোষ্টেলটিতে ৩০ জন ছাত্রী অবস্থান করিতেছিল, ডাকাতরা প্রথমে সেখানে হামলা চালায়। সেহরির সময় একজন ছাত্রী হাতমুখ ধোয়ার জন্য রুম হইতে বাহির হইয়া বারান্দা দিয়া বাথরুমে যাইতেছিল, ২/৩ জন দুষ্কৃতিকারী ছাত্রীকে চাপিয়া ধরে। দুষ্কৃতিকারীরা সেই অবস্থায় তাহাকে তাহার রুমে লইয়া যায় এবং তাহার ঘড়ি কলম টাকা পয়সাও গায়ের অলঙ্কার ছিনাইয়া নেয়। ইহার পর দুষ্কৃতিকারীরা ৭/৮ জন করিয়া বিভক্ত হইয়া প্রত্যেক ছাত্রী রুমে প্রবেশ করে এবং পিস্তল ও ছোরার ভয় দেখাইয়া তাহাদের ঘড়ি, কলম, অলঙ্কারাদী ও জিনিসপত্র লইয়া যায়।
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উক্ত হোষ্টেলে তিনজন ছাত্রী সাংবাদিকদের নিকট উপরোক্ত ঘটনাবলী বর্ণনা করেন। দুষ্কৃতকারীরা তালা ভাংগিয়া ছাত্রীদের কমনরুমে প্রবেশ করে এবং সেখান হইতে রেডিও ও টেলিভিশন সেটও লইয়া গিয়াছে।
(দৈনিক আজাদ, ১১ নভেম্বর ১৯৭১)
খবরটি আরো বড় এবং পত্রিকাগুলো খবরটিকে গুরুত্ব দিয়েই ছাপে।
সেদিন ইত্তেফাক কোন খবরগুলো ছেপেছিল? ভাঁজের ওপরেই শেষ কলামে ছাপা হয়েছিল একটি খবর। পরে ইতিহাস পাঠ করে জানা গেছে এপিপি পরিবেশিত খবরটি ছিল ভুয়া। এপিপি এভাবেই পাকিস্তান সম্পর্কে ভুল তথ্য দিত এবং তা পরিবেশন করতে বাধ্য হতো পত্রিকাগুলো। সংবাদটির খবরের শিরোনাম ছিল:
জেনারেল নিয়াজীর ফেনী ও বিলোনিয়া সফর
এপিপি পরিবেশিত এক খবরে বলা হয়: ইস্টার্ন কম্যান্ডের কমান্ডার এবং খ এলাকার সামরিক আইন পরিচালক লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি গতকাল (বুধবার) ফভেনী, বিলোনিয়া ও চট্টগ্রাম সফর করেন এবং সেখানে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার ও জওয়ানদের সহিত সাক্ষাৎ করেন।
ফেনী গমন করিলে স্থানীয় কমান্ডার তাহাকে সম্বর্ধনা জানান এবং তাহার কাছে সীমান্ত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। কম্যান্ডার জেনারেল নিয়াজীর কাছে জানান যে, সীমান্তের গ্রামগুলির উপর বিনা উস্কানিতে ভারতীয় গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় সেখানে নিরীহ নর-নারী ও শিশুরা হতাহত হইতেছে। সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সৈন্য ও তাহার এজেন্টদের চাপ বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়াও তিনি জানান।
জেনারেল নিয়াজী বিলোনিয়ায় সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের সহিতও সাক্ষাৎ করেন। পরে তিরি চট্টগ্রামে এক সংক্ষিপ্ত সফরে গমন করেন।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ নভেম্বর, ১৯৭১)
খবরটি যে ডাহা মিথ্যা, তার প্রমাণ পাওয়া যায় যুদ্ধ শেষ হলে। ১৯৭১ এর ৫ নভেম্বর, মধ্যরাতে একদিক থেকে দশম রেজিমেন্ট আরেক দিক থেকে দ্বিতীয় রেজিমেন্ট গোপনে ভারতের অংশ থেকে বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ শুরু করে। ১০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় পাকিস্তানিদের সঙ্গে। ১১ নভেম্বর বিলোনিয়া মুক্ত হয়। পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেওয়া হয়, গ্রেপ্তার করা হয় অনেককে। সেই ভয়াবহ যুদ্ধের সময় নিয়াজী বিলোনিয়ায় গেছেন, এ রকম বানোয়াট খবরও তখর এপিপির বরাতে ছাপা হতো।
ইত্তেফাকে এভাবে ছাপা হয়েছে আরেকটি খবর:
ইন্দিরা ‘বাংলা দেশের স্বাধীনতা চান
প্যারিস, ১০ই নভেম্বর (এপিপি/রয়টার) ফরাসী সম্পাদকদের দ্বারা কোনঠাসা হইয়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী সোমবারে স্বীকার করেন যে, তিনি ‘বাংলা দেশের’ স্বাধীনতার পক্ষে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন যে, সংকটের যে-কোন সমাধানের শর্ত হইতেছে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। তিনি ইহাও পরিস্কার করিয়া বলেন যে, শেখ মুজিবের মুক্তি ছাড়া ভারত উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দিবে না।
ফ্রান্সের নেতৃস্থানীয় সম্পাদকদের সহিত এই টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মিসেস গান্ধীকে সীমান্ত হইতে সৈন্য প্রত্যাহারে তাঁহার অসম্মতির বিষয়ে বার বার প্রশ্ন করা হয়। গেরিলাদের ট্রেনিং দান, গেরিলাদের ভারতীয় অস্ত্র সরবরাহ এবং তাঁহার বিবেচনায় পূর্ব পাকিস্তানের চূড়ান্ত সমাধান সম্পর্কে বার বার প্রশ্ন করা হয়।
টেলিভিশনের বৈদেশিক দফতরের প্রধান সমালোচনামূলক প্রশ্নের এই ধারা শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক গৃহীত এবং মিসেস গান্ধী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত বিভিন্ন প্রস্তাবের উপর আলোকপাত করিয়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে মন্তব্য করিতে বলেন।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, ‘স্বাধীনতাই পূর্ব বাংলার একমাত্র সমাধান এবং আগে হউক পরে হউক ইহা আসিবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, ‘হ্যাঁ, ‘স্বাধীন বাংলা দেশই একমাত্র সমাধান এবং এই স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী।’
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সহিত সাক্ষাৎ করিতে তিনি অসম্মতি জানাইয়াছেন কেন—এই প্রশ্নের জবাবে মিসেস গান্ধী বলেন যে তিনি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে এবং পাক-ভারত সমস্যাবলী লইয়া আলোচনা করিতে ইচ্ছুক আছেন। কিন্তু বাংলার সমস্যা সমাধান ‘বাংলা দেশের’ জনসাধারণকেই করিতে হইবে।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ নভেম্বর, ১৯৭১)
এই প্রতিবেদনে কিছুই লুকানো নেই। পাকিস্তানি সংবাদ সংস্থা যদিও ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তব্যকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাংলার পাঠক এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে জেনে গেছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভারতের অবস্থানের কথা, মুক্তিবাহিনীকে ভারত কর্তৃক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়ার কথা। এই সংবাদ ছাপা হওয়ায় পাকিস্তানি দালালেরা ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বিষোদ্গার করা শুরু করলেও মুক্তিকামী বাংলা বুঝে গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিবাহিনী সক্রিয় রয়েছে। ভারতও তাদের সহায়তা করছে।
অপরদিকে অবরুদ্ধ বাংলায় পাকিস্তানের দালাল সংবাদপত্রগুলো পাকিস্তানের পক্ষে এবং পাকিস্তানের তাবেদারদের পক্ষে যে সংবাদগুলো ছেপে চলেছিল, সেগুলো দেখেই পরে হানাদার বাহিনী ও তার এদেশীয় দোসরদের নৃশংসতার প্রমাণ পেয়েছিল বাংলাদেশ।
অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত একাত্তর-১৫
তথ্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও আজ লেখাটির ইতি টানব। আশা করব, ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের কেউ একজন আমার হাত থেকে রিলে রেসের ব্যাটনটি তুলে নেবেন এবং ইতিহাসের এই স্বল্প আলোকপাত করা বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণা করবেন।
কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী এখন বলার চেষ্টা করছেন, একাত্তরে শহীদ হওয়া ছাড়া বুদ্ধিজীবীদের কোনো অবদান নেই। যারা এ সব কথা বলছেন, তারা প্রতিভাবান মানুষ বটে, কিন্তু তারা মনে করে থাকেন, যা খুশী বলার লাইসেন্স রয়েছে তাদের। গায়ের জোরে মিথ্যেকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যেয় পরিণত করতেও এদের বাধে না। এরা মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী নেতৃত্বের কারণে নাখোশ হয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান তৈরি করতে গিয়ে তথ্য-উপাত্তকে উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে খোশ গল্প তৈরি করতে চাইছেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারী চৈনিক বাম ও জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক দলের লোকেরাই এই যজ্ঞে সামিল হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়তে থাকে, তাতে স্রোতের খড়ের মতো ভেসে গিয়েছিল অন্য দলগুলোর বড় বড় নেতারা। ‘এক নেতা এক দেশ-বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ শ্লোগানটার জন্ম এমনি এমনি হয়নি। সে সময়কার দেশি-বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে খোঁজ করলেই জানা যাবে, আওয়ামী লীগ সে সময় রাজনীতির কোন উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
আওয়ামী লীগ তাদের শাসনামলগুলোয় অনেক ভুল করেছে, বঙ্গবন্ধুকে বড় করতে গিয়ে অন্যদের অবদানকে খাটো করেছে, সেটা সত্য, সে আলোচনাও হতে হবে। কিন্তু ১৯৭১ সালকে নিয়ে চৈনিক বাম বা জামায়াতী রূপকথার কাছে আগামী প্রজন্ম পরাজিত হবে—এ রকম ভাবার কোনো কারণ নেই।
এ কথাও মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা লাভের পর যে দলগুলো ক্ষমতায় এসেছে, সে দলগুলো ক্ষমতা কুক্ষীগত করেছে এবং মেয়াদের সময় অনুযায়ী যেটুকু সম্ভব স্বৈরাচার হয়ে উঠেছে। জামায়াতে ইসলামী কিংবা ইসলামী ছাত্র শিবির ক্ষমতার পরশ পেয়ে এবং না পেয়েও যে নৃশংসতা চালিয়েছে, সে কথাও মনে রাখতে হবে। ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে একের পর এক নব্য ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছে এই দেশে, যা দেশের জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। সুতরাং কোনো একদিন এই বিষয়গুলোও গবেষণায় উঠে আসা দরকার।
১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ নগরীর ভয়ার্ত পরিবেশে সাংবাদিকেরা কীভাবে নিরন্তর সংবাদ প্রচার করার দায়িত্ব পালন করেছেন, তার কিছু নমুনা এই ধারাবাহিক লেখায় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আজ দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংগ্রামের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে কিছু কথা বলা হবে। যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ছাড়া বৃদ্ধিজীবীদের আর কোনো অবদান নেই বলে বয়ান তৈরি করছেন, তাদের গালে এ হবে এক বিশাল থাপ্পড়।
জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম পাকিস্তানের পক্ষে লিখে গেছে পুরো একাত্তর জুড়ে। তাদের লেখাতেই পাকিস্তানি দালালদের কর্মকাণ্ডের বিশদ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একাত্তরের সংগ্রাম পত্রিকা অনুসরণ করলেই পাকিস্তান-দরদি বাঙালিদের চরিত্রের ব্যাখ্যা করতে পারবেন সচেতন পাঠক। একবিংশ শতাব্দির নতুন মানুষেরা সেই সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করে দালালি মানসিকতার নমুনা পেতে পারেন।
সিরাজুদ্দীন হোসেন ১৯৭১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’ শিরোনামে একটি রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখেছিলেন। কী ছিল সেই নিবন্ধে? সিরাজুদ্দীন হোসেন সেই নিবন্ধে প্রমাণ করেছিলেন, যে বিচ্ছিন্নতাবাদের অপবাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বয়ান পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডেই প্রতিফলিত হচ্ছে। তাহলে শুধু আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করা কেন?
নিবন্ধের কয়েকটি চুম্বক জায়গা তুলে ধরা যাক।
‘বিগত নির্বাচন প্রমাণ করিয়াছে যে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনই দেশপ্রেমের সুনিশ্চিত সার্টিফিকেট নয়।’ কথাটি বলিয়াছেন জামায়াতে ইসলামীর অস্থায়ী আমির মিয়া তোফায়েল। বলা বাহুল্য, কথাটি তিনি বলিয়াছেন পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলির প্রতি ইঙ্গিত করিয়া। স্বভাবতই আশা করা গিয়াছিল , এবার পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিকদের নিকট হইতে প্রকৃত দেশপ্রেম সম্পর্কে দেশবাসী অনেক কিছু শিখিতে পারিবে এবং এই ‘দেশপ্রেমিক’ রাজনীতিক’রাই দেশকে বর্তমান সংকট-সন্ধিক্ষণ হইতে মুক্ত করিয়া দেশবাসীর সামনে একটি উজ্জ্বল নজির প্রতিষ্ঠা করিবেন। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে আইনসিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর কথাবার্তা ও চালচলনে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের যে চেহারা দাঁড়াইয়াছে, তাহাতে দেশের শুভাকাঙ্খীমাত্রেই প্রমাদ না গনিয়া পারেন না।’
…‘দেশবাসী মুখ না খুলিলেও রাজনীতিকেরা যে নিয়মে আজ মুখ খুলিয়াছেন, তাহাতে ‘দেশপ্রেমিক রাজনীতিক’ বলিতে দেশে আজ কে আছেন, এই প্রশ্নই আজ বড় হইয়া দেখা দিতেছে।
‘সামান্য স্মৃতিচারণা করিলেই দেখা যাইবে কাইয়ুম লীগ প্রধান জনাব আবদুল কাইয়ুম খানই রাজনীতিকদের দেশপ্রেমের প্রশ্নে সর্বাধিক প্রগল্ভ। পূর্বাঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দেশপ্রেমের অভাবই সব অনর্থের মূল জানিয়াই জনাব কাইয়ুম প্রমুখ আগাইয়া আসিয়াছেন দেশের সংকট মুক্তির পথনির্দেশ করিতে।’
নিবন্ধটির পরতে পরতে প্রমাণ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ছাড়াও পাকিস্তানের উভয় অংশের রাজনৈতিক দলগুলোও একে অন্যের ব্যাপারে বিচ্ছিন্নতাবাদেরই অভিযোগ আনছে। কিংবা নিজেরা ছাড়া আর কেউ দেশপ্রেমী নয়, সে কথা প্রমাণ করতে চাইছে।
সেটা বোঝার জন্য সংবাদ প্রতিবেদনের আরো কিছু অংশ তুলে ধরছি:
`…নাম করিয়া না বলিলেও পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য দল সম্পর্কে তার বক্তব্য রহিয়াছে। তার মতে, ‘পাখতুনিস্তান’, ‘জিয়ে সিন্ধ’, ‘বৃহত্তর বেলুচিস্তান’, এবং ‘ছয় দফা পাঞ্জাবের জন্য কল্যাণকর’—পাঞ্জাবের একশ্রেণীর রাজনীতিকের এই ধরনের চিন্তাধারা ‘বাংলাদেশ’ স্লোগানের মতোই পাকিস্তানের মৌলিক আদর্শের পরিপন্থী।’ তার মতে, ‘পশ্চিম পাকিস্তানেও এমন দল ও লোক রহিয়াছে, বিদেশের সহিত যাহাদের যোগসাজস রহিয়াছে এবং তাহাদের অর্থানুকূল্যেই তাহারা লালিত (রাওয়ালপিন্ডি, ২৬ জুন)।
‘… জনাব ভুট্টোর মতে, ‘যেহেতু সিন্ধু পাকিস্তানেরই অংশ, সেইহেতু “জিয়ে সিন্ধ” স্লোগান তোলার অধিকার ছাত্রদের রহিয়াছে এবং এই উত্তোলন হইতে কেহই তাহাদিগকে বিরত করিতে পারেন না। (শুক্কুর, ১০ সেপ্টেম্বর)।
মুসলিম লীগ নেতাদের সম্পর্কে জনাব ভুট্টোর বিস্ময়ের কারণ হইল, ‘সেই একই মুসলিম লীগ নেতারা যারা অন্যান্য স্বার্থের পাবন্দি করিয়া সব সময়ে পাকিস্তানের স্বার্থ বিপর্যস্ত করিয়া আসিয়াছেন, তাহারা কি করিয়া জাতীয় আদর্শ সংরক্ষণ করিবেন’ তাহা তিনি ভাবিয়া পান না। (করাচি, ১১ আগস্ট)।
অন্যদিকে, কাউন্সিল লীগ নেতা মিয়া মমতাজ দৌলতানার মতে, পশ্চিম পাকিস্তানেও রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিদের অবশ্যই দমন করা দরকার। ইহারা এখনো সমানে সক্রিয় রহিয়াছে এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পক্ষে সব সময়েই বিপদের কারণ হিসেবে বিরাজ করিতেছে।’ (নবাব শাহ, ২১ আগস্ট)
তার মতে, ‘যারা দেশের সমাজতান্ত্রিক অথবা অন্য কোন বিদেশী জীবন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করিতে চান, উহাদের অন্য দেশে হিজরত করিতে হইবে, কেননা পাকিস্তানে তাদের স্থান নাই। (শিয়াল কোট ৩০ জুলাই)।
জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম নেতা (হাজারভী গ্রুপ) মুফতি মাহমুদের মতে, ‘যেসব দল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করিয়াছে এবং এখনো করিতেছে তাহাদিগকে বেআইনি ঘোষণা করিতে হইবে (১৪ মে)। খান কাইয়ুম-এর মতে অবশ্য ‘জমিয়ত নেতারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করিয়াছেন এবং সেই চিন্তা ধারা তারা আজও বিসর্জন দেন নাই।’
জামায়াতে ইসলামী নেতা জাতীয় পরিষদ সদস্য করাচির আব্দুল গফুর ও মাহমুদ আজম ফারুকী অবশ্য চান, সরকার অবিলম্বে পিপিপির গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করুন এবং ভুট্টো ও অন্যান্য পিপিপি নেতার বিরুদ্ধে সামরিক বিধি মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। (করাচি ১১ জুলাই)।
সিরাজুদ্দীন হোসেন তার এই লেখায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তাতে দেখা যায় যে এরা একে অন্যকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলছে অথবা বিদেশের ষড়যন্ত্রের অংশী হিসেবে তাদের দায়ী করছে। আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কোন কথা না বলেও তিনি বলে দিয়েছেন, যে কারণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে সেই একই অভিযোগ আনছে। তাই সিরাজুদ্দীন হোসেন নিবন্ধটি শেষ করেছেন এই কথা বলে যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা-উত্তর দেশের ‘দেশপ্রেমিক’ রাজনীতিক মহলের ইহাই হইল চেহারা।
সিরাজুদ্দীন হোসেনের ‘ঊর্ধ কমার ব্যবহার লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, তিনি পাকিস্তানের ‘দেশপ্রেমিক’ রাজনীতিবিদদের কীভাবে বিদ্রুপ করছেন।
এরই প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাদের পত্রিকায়। সেখানে সরাসরি ইত্তেফাককে হুমকি দেওয়া হয়। নিবন্ধটি তারা শেষ করেছিল এই কথা বলে, ‘…তাই আপামর জনতার আজকের দাবী হচ্ছে, ঠগ বাছতে গিয়ৈ গাঁ উজাড় হয়েও যদি দেশ বাঁচে, তবুও ভালো।’
জামায়াতে ইসলামী যে দেশকে বাঁচাতে চেয়েছিল, সে দেশ আর সেভাবে বাঁচেনি। নতুন দেশ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। এবং সেই বাংলাদেশ জন্মের সমস্ত যন্ত্রণা বুকে করে নিয়ে শহীদ হয়েছেন সেই সাংবাদিকেরা, যাদের রক্তে তৈরি হয়েছে একটি মানচিত্র।
নতুন প্রজন্মের তরুণেরা সেই ইতিহাসের কাছেই ফিরে যাবে বলে আমি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
(শেষ)

