জাহীদ রেজা নূর
একুশ এলেই কিছু গৎবাঁধা কথা বলে যাই আমরা। ইতিহাসের কিছু বর্ণনা, একুশের চাওয়া-পাওয়ার খতিয়ান করা এবং সাফল্যের পথে এগোতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার প্রতিবেদন হয়ে ওঠে প্রতিটি বছরের মানচিত্র। এমনকি এই রক্তাক্ত তারিখটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেলেও আমরা দেখতে পাই, ভাষা প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথটি বন্ধুর।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না, সে প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল আমতলার বৈঠকে। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে শিক্ষার্থীদের সে বৈঠক থেকেই বেরিয়ে এসেছিল দশজনি মিছিলগুলো। ছাত্ররা গ্রেপ্তার হয়েছিল অকাতরে। বিকেলে ছিল পরিষদের সভা। ছাত্ররা পরিষদ ভবনে পৌঁছে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানাতে চেয়েছিল। এবং সে সময়ই অনাকাঙ্খিতভাবে গুলি চলল। আর গুলিবর্ষণের ঘটনাই পাল্টে দিল এই বাংলার ইতিহাস। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা আন্দোলনে বারুদে যেন আগুন লাগল। তৈরি হলো একুশের পথ।
একুশের পথ ধরেই আমাদের দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল। মাত্র কয়েক বছর আগে ১৯৪৭ সালের কিছু সময় আগে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য যে বাঙালি মুসলমান একাট্টা হয়েছিল, এত কম সময়ের মধ্যে কী করে তারা পূর্ণভাবে নিজ অধিকারের প্রশ্নে ঘুরে দাঁড়ালো, পাটাতন হিসেবে পেল নিজ সংস্কৃতিকে— সেটা ইতিহাসের এক মহাবিস্ময়। সে সময়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছে একটি দেশ—বাংলাদেশ যার নাম। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালির এই অভিযাত্রার স্বর্ণালী আভায় আমরা উদ্ভাসিত হই। কিন্তু মূলত এই একটি মাসেই ভাষা নিয়ে আমাদের দরদ উথলে ওঠে। এরপর যে কে সেই।
আমরা এই একুশ দিনের আলোচনায় একুশের আগে-পরের বেশ কিছু কথা বলব। বাংলা ও উর্দুর বাহাস অর্থাৎ ভাষা বিতর্ক নিয়ে কথা হবে। সে সময়কার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে কথা হবে, সে সময়ের পত্র-পত্রিকা নিয়ে কথা হবে। আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে বায়ান্ন থেকে একাত্তর অবধি বাঙালি ও তৎকালীন পূর্ববাংলার অন্যান্য অধিবাসীরা যে আশ্চর্য ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে, তাকে স্বপ্নের মতো মনে হবে। এই সময়কালের আগে-পিছে এতোটা ঐক্যবদ্ধ জনস্রোত বাংলার ইতিহাসে দেখা যায়নি। পরবর্তীকালে ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের পথ বেয়েই একাত্ম হওয়া দেশবাসীকে দেখা গেছে স্বমূর্তিতে। ঐক্যবদ্ধতার যে নজির দেশবাসী তৈরি করেছিল, সেটা পরবর্তীকালে আর সেভাবে টিকে থাকেনি। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে জাতি। আমরা এখন সেই বিভক্তির মধ্যেই বসবাস করছি।
কিন্তু যে আলো জ্বলেছিল সেদিন, তারই পথ ধরে এগোনোর জন্য একটা মশাল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সে মশালের আলোয় পথ চলে স্বপ্নাতুর জাতি। একুশ নিজেই হয়ে আছে সেই মশালটি।
আমরা কথা বলার সময় বাংলা ভাষার দিকে নজর রাখব। আমরা দেখার চেষ্টা করব, বাঙালি মুসলমানের শিক্ষিত একাংশ কেন বাংলাকে মুসলমানের মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। কেন তারা উর্দুকে চাইছিলেন মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। আমরা উত্তর খুঁজব এই প্রশ্নের—অভিজাতশ্রেণী ছাড়া আর সব শ্রেণীর মধ্যেই বাংলায় হতো কথোপকথন, তবুও কেন এই উর্দুপ্রীতি থেকে সরে আসেনি অভিজাতেরা। দেখব, শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই রাজনীতির পরিণাম কী হয়েছিল।
উর্দুর প্রতাপের বিরুদ্ধে বিশ শতকের শুরুর দিকেই বাঙালি মুসলমানের আত্ম-অন্বেষা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সাংস্কৃতিক এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক আবহ দিয়ে মোড়া ছিল বলেই বাংলা ভাষার বিরোধীতা করার সময় ধর্মকে টেনে আনা হয়েছে। ধর্মকে জড়িয়ে ভাষা প্রশ্নটিকে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এবং সে সময়কার বাঙালির একটি বড় অর্জন হলো, তাকে ধর্মের বড়ি গেলানোর সাধ্যমতো চেষ্টা করা হলেও ভাষা-প্রশ্নে সে আপোষ করেনি।
ক্রমান্বয়ে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে দিতেই আমরা পৌঁছে যাব একুশের কাছাকাছি।
আত্মপরিচয়ের পথে
নদী-তীরবর্তী জনপদ থেকেই উত্থিত হয়েছে ভাষা। বহু আগে যে কোনো জনপদের রাজনৈতিক, সামাজিক আর বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থান ছিল প্রধান প্রধান নদীগুলির সংযোগস্থলে। অথবা যে সব জায়গা থেকে সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা সহজ ছিল, সে সব জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। সে কথাও বলব আমরা খানিক পরে।
একুশের কাছে যেতে হলে এই পথটা পাড়ি দেওয়া দরকার। বায়ান্নর আত্মদানের ঘটনা শুধু পাকিস্তান আন্দোলন ও ভাষা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকার ব্যাপার নয়। বাঙালি সত্ত্বা বিকশিত হওয়ার পথটি চিহ্নিত করার প্রয়োজন সবার আগে। বাংলা ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে ছোট্ট একটি আলোচনা এই পথটি চিনে নিতে সাহায্য করবে। ব্রিটিশ ভারত ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র গড়ে ওঠার পরই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলা আর উর্দু নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে কেউ ভাবলে সে ভাবনা হবে ভুল। আটচল্লিশ সালে এসে কেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুধু উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সাফাই গাইলেন, কেন রেসকোর্সের সভায় এবং কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহর বক্তব্যে ফুঁসে উঠল বাংলার জনগণ, সেটা বুঝতে হলেও আমাদের দূর-ইতিহাসের কাছে যেতে হবে। এই জ্বলে ওঠা বা জেগে ওঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথ। যদিও আমরা ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ কিংবা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে চিহ্নিত করতে পারি, কিন্তু ইতিহাসের বহমান এই কালপর্বটি এত বিস্তারিত যে নির্দিষ্ট করে সময় চিহ্নিত করা কঠিন।
ইতিহাসের পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা লক্ষ্য করব, প্রাচীন পূর্ব ভারতে একভাষিক রাষ্ট্রসত্তা বা একভাষিক জাতিসত্তা ছিল না। একটি নিরবচ্ছিন্ন ভৌগোলিক এলাকাও ছিল না। ছিল খণ্ড খণ্ড জনপদ। সে সব জনপদে বাস করত অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, তিব্বতি-চীনা ভাষাভাষী বহু কোম ও নরগোষ্ঠীর মানুষ। ইন্দো-আর্যভাষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত ও সংমিশ্রণের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠী একটি রূপ পাচ্ছিল। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঋদ্ধ করে তুলছিল এই দুই গোষ্ঠীকেই। যে সময়ের কথা বলছি আমরা, সে সময় বাংলা বা বাঙ্গালা নামে কোনো অঞ্চল ছিল না। অনুমান করা যায় সেকালের বঙ্গ গড়ে উঠেছিল বর্তমান কালের ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চল নিয়ে। আর সম্ভবত তার সঙ্গে যুক্ত ছিল খুলনা আর বরিশাল অঞ্চল। খ্রিস্টিয় আট শতক পর্যন্ত বঙ্গের রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল খুব কম।
ব্যারি এম মরিসনের ‘রিজিওন অ্যান্ড সাব-রিজিওন ইন প্রি-মুসলিম বেঙ্গল’ ও ‘পলিটিক্যাল সেন্টার্স অ্যান্ড কালচারাল রিজিওনস ইন বাংলা’ নামের বইদুটোর বরাত দিয়ে মমতাজুর রহমান তরফদার জানিয়েছেন, প্রাক-মুসলিম যুগে বাংলায় মোট চারটি রাজনৈতিক বিভাগ ছিল। ছিল বরেন্দ্র ভূমি, যা গঙ্গার উত্তর দিকের অঞ্চল, যমুনার পূর্বে ও মহানন্দার পশ্চিমে অবস্থিত ভূখণ্ড নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। ভাগিরথী-হুগলী নদীর দুই তীর ধরে এবং বর্তমান কালের চব্বিশ পরগণা ও মেদিনীপুর নিয়ে গড়ে উঠেছিল আরেকটি প্রশাসনিক অঞ্চল। সুরমা ও মেঘনার পূর্বে অবস্থিত শ্রীহট্ট-কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম নিয়ে ছিল সমতট। ঢাকা ও ফরিদপুর নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গ।
এখন যারা বাংলা বলে থাকেন বিভিন্ন অঞ্চলে, প্রাক-মুসলিম যুগে সে রকম কোনো একভাষিক রাষ্ট্র বা একভাষিক জাতি ছিল না। তাদের মধ্যে ছিল না কোনো আঞ্চলিক সংহতি। সেটা কিন্তু গড়ে উঠেছে ক্রমে ক্রমে, মোগল শাসনামলে এবং ব্রিটিশ আমলে। এই কথাটা মনে রাখলে আমরা একুশের কাছাকাছি হওয়ার একটা পথ খুঁজে পাব। আমরা বুঝতে পারব, বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক সংকটটা কোথা থেকে শুরু হচ্ছে।
আমরা একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারব, পনের ষোলো শতক থেকে আঠার শতকের মধ্যে দক্ষিণ-পুর্ব বঙ্গে যে কয়জন কবি-সাহিত্যিককে আমরা পাই, তাদের মধ্যে একটা সংযোগ ছিল বলে মনে হয় না। তাদের মনে ছিল দ্বন্দ্ব, কোন ভাষায় তিনি সৃষ্টি করবেন সাহিত্য? শিক্ষিত মুসলমান বেছে নিয়েছিল আরবি ও ফারসিকে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষের ভাষা বাংলা। তাহলে বাংলা ভাষায় কি ধর্মীয় ও ঔপাখ্যানিক রচনা লেখা উচিৎ হবে? এই দ্বিধার আগুনে জ্বলে পড়ে মরেছে বাঙালি মুসলমান। পাঠক, লক্ষ্য করুন, সে সময় পর্যন্ত কিন্তু উর্দু নামে কোনো ভাষার সঙ্গে কারো কোনো সাক্ষাৎ হয়নি।
বেড়ে ওঠার কাল
কত না বিচিত্র সম্ভার নিয়ে ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা ভাষা!
বাংলার আদি অধিবাসীদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ভাষাই ছিল বাংলা। তারা বাংলা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতেন না। অন্য যে ভাষাগুলো পরে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছে, তার কোনোটাই প্রাকৃত বাঙালির মুখের ভাষা ছিল না। শিল্পী আবদুল লতিফ যখন ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে গাইলেন ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, তখন ষ্পষ্টতই তিনি বুঝিয়ে দিলেন ‘আমার মুখের ভাষা’ কোনটি।
একটি লোকগোষ্ঠীর প্রধান পরিচয় তার ভাষায়। আমরা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর কথা শুনেছি অনেক। ভাষাতত্ত্বে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। কী করে প্রাকৃত ভাষা থেকে এ যুগের ভারতীয় ভাষাগুলোর জন্ম হয়েছে, সে কথাও আর অজানা নয়। তাই ভাষা আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে গেলে বলতে হবে, এই ভূখণ্ডে যে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো একদা বসবাস করেছে কিংবা পরে তাদের কেউ কেউ সংমিশ্রণের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে একজাতিতে, তাদের ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যেই খুঁজতে হবে বাংলা ভাষার উপাদান। এরা সবাই মায়ের মতোই শিশু বাংলা ভাষাকে আগলে রেখেছিল। তাই ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর পাশাপাশি অস্ট্রিক, মঙ্গলীয় ও দ্রাবিড় উপাদান দেখতে পাওয়া যাবে বাংলা ভাষায়।
আর্য-অনার্য নানা ভাষার মিশ্রণ আছে বাংলা ভাষায়। আমাদের গ্রামগুলোর নাম দেখুন, আমাদের নদীগুলোর নাম দেখুন, হাট-বাজার-গঞ্জের নাম দেখুন, আপাত দুর্বোধ্য নামগুলো বুঝিয়ে দেয়, এই নামগুলোর শিকড় অনেক গভীরে। করাত, দা, বাখারি, পগার, বরজ, কানি শব্দগুলো কত যুগের স্মৃতি বহন করছে, তা নির্ণয় করা কঠিন।
গাঙ্গেয় বদ্বীয় এলাকার ভূবৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি এখানকার মানুষদের সামাজিক জীবন ও অর্থনীতিকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। ধীরে ধীরে দূরের মানুষেরা কাছে এসেছে। এবং ইতিহাস বলে, এই মানুষদের কাছাকাছি আনার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে সুলতানি আমলের রাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। আমরা চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝিতে চোখ রাখব। সে সময় ইলিয়াসশাহী শাসনের শুরুতে রাঢ়, বরেন্দ্র, গৌড়. সমতট, লখনৌতি, সোনারগাঁ, বঙ্গ অঞ্চলগুলো একই শাসনব্যবস্থার অন্তর্গত হয়েছিল। এবং সে সময়ই এই পুরো অঞ্চলটা বাঙ্গালা নামে পরিচিত হতে শুরু করেছিল। এই সময়টিতে বাংলা ভাষা হয়ে উঠেছিল সর্ববঙ্গীয়। অর্থাৎ একটা ভূখণ্ড, তার পরিণত ভাষা, সাহিত্যে তার প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেল। লোকগোষ্ঠী গঠন শুরু হয়েছিল পাল আমলে। চৌদ্দ-পনের শতকে এসে ধীরে ধীরে তা পরিণত হতে থাকল।
মনে রাখতে হবে, দ্বাদশ শতাব্দীতে দেশীয় ভাষায় শাস্ত্রচর্চা করা নিষেধ ছিল। এমনও বলা হতো, কেউ যদি দেশীয় ভাষা, এক্ষেত্রে বাংলা’য় শাস্ত্রচর্চা করে, তবে সে মৃত্যুর পর রৌরব নামের নরকে যাবে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ও সামাজিক বলয়ে ব্রাহ্মণের দাপট তখন চরমে। তাই ‘দেবভাষা’ সংস্কৃতের জয়জয়কার।
শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ১৩৯০ সালের দিকে বাংলায স্বাধীন সুলতানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে সময় রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং স্থানীয় সামন্তপ্রভূদের উৎসাহে স্থানীয় ভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চা উৎসাহিত হয়েছিল। বাংলা ভাষা তাতে সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু মোগল শাসনের সময় কিন্তু দেখা যায় এর বিপরীতচিত্র। এ সময় যে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল, সেই গোষ্ঠী মাতৃভাষাকে সুনজরে দেখেনি। মাতৃভাষার বিরোধীতা করেছে তারা। বাংলা ভাষায় কাব্য রচনার কারণে সৈয়দ সুলতানকে ‘(১৫৫০ খ্রি-১৬৪৮ খ্রি) মোনাফেক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এরপর আমাদের মনে পড়ে যাবে কবি আবদুল হাকিমের নাম। যিনি সখেদে বলেছেন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ সে কথাই হবে এবার। এবং বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দুহিতা কিনা, তা নিয়ে যে বিতর্ক উঠল, সে বিতর্কের বিষয়টিও খোলাসা করা হবে।
মুসলিম লেখকদের আবির্ভাবের কাল
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলায় এসে সেন বংশীয়দের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেন ১২০৪ সালে। কিন্তু বাংলায় মুসলমানেরা তখনই প্রথম প্রবেশ করল, এমন নয়। এর অনেক আগে থেকেই আরব বণিকেরা বাণিজ্যের স্বার্থে বাংলায় আসত। চট্টগ্রামে আরবদের একটা উপনিবেশও ছিল। দক্ষিণের সমুদ্রপথেই ছিল বণিকদের যাওয়া-আসা।
মুসলিম জনগোষ্ঠী এই ভূখণ্ডে তাদের স্বকীয় ভাষা, ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে আসে। সে সময় এই অঞ্চলে হিন্দু রাষ্ট্রকাঠামোর অনেক দুর্বলতা ছিল। বর্ণপ্রথা-বিড়ম্বিত মানুষ সহজ মুক্তির পথ খুঁজছিল। হিন্দু সমাজপতিরা সহজে মুসলমানদের মেনে নেয়নি। বিশেষ করে প্রচলিত ধর্মব্যবস্থার জায়গায় একেবারে নতুন ধরনের ধর্মের আবাহন এই বৈরিতাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। ফলে বহিরাগত সংস্কৃতির সঙ্গে প্রচলিত সংস্কৃতির সংঘাত ছিল অনিবার্য। নতুনকে সহজে কেউ পথ ছেড়ে দেয় না। কিন্তু সেই সংঘাত ক্রমশ সমন্বয়ের দিকে যেতে পারল স্রেফ এই কারণে যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাঙন ও অবক্ষয় নতুন একটা কিছু চাইছিল। রাষ্ট্রশক্তি মুসলমানের হাতে চলে আসায় ইসলামের ভ্রাতৃত্বের আহ্বানে স্থানীয় অনেকেই আকৃষ্ট হয়েছেন। ফলে সে সময় শুরু হয়ে যায় সামাজিক পুনর্গঠন। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাষাগত বিনিময় ও বিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকে। সাংস্কৃতিক বিনিময় মিলন ও ঐক্যের নির্ধারক হয়ে ওঠে। দুটি ভিন্ন সমাজব্যবস্থা পরস্পরের কাছাকাছি হলে প্রথমে সংঘাত অনিবার্য, এরপর থাকে সংশ্লেষণের পর্যায়। বাংলায় সমাজব্যবস্থাও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই এ রকম সংঘাত ও সংশ্লেষণের মাধ্যমে এগিয়েছে।
সমাজে যে সংশ্লেষণ চলছে, তা বোঝা যায় সাহিত্যের দিকে নজর দিলে। বাংলা জয় করে নিল মুসলিমরা। কিন্তু এরপর প্রায় দুশো বছর অপেক্ষা করতে হলো মুসলমানদের হাতে সাহিত্য প্রকাশের জন্য। সে সময় মুসলমান সম্প্রদায় বাংলা ভাষায় মধ্যে নিজেকে প্রকাশের অবলম্বন খুঁজে পেল। বলা হয়ে থাকে, বাংলায় মুসলিম বিজয়ের আড়াইশো বছর পর রুকুনউদ্দিন বারবক শাহের (১৪৫৫-৭৬) আমলে বাংলা কবিতার পুনর্জন্ম হয়। তাতে মনে হয়, এই সময়টায় যে ভাঙন, সমন্বয়, পরিবর্তন, বিবর্তনের খেলা চলে, তা স্থিত হওয়ার পরই কেবল উন্নত সাহিত্যের দেখা মেলে।
গোটা বাংলা জয় করতে মুসলিমদের লেগেছিল প্রায় দুশো বছর। ফলে ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে ভাববার অবকাশ ছিল না। বাংলা যারা জয় করেছিলেন, তারা বাঙালি ছিলেন না, কিন্তু যে বাঙালি মুসলমানেরা সাহিত্য রচনায় নিবিষ্ট হলেন, তারা ছিলেন নির্ভেজাল বাঙালি। ধর্ম প্রচারের জন্য যে সুফী সন্তরা বাংলাদেশে এসেছিলেন, তারাই মূলত ইসলামকে নিয়ে গেছেন সাধারণ মানুষের কাছে। সুফী সম্প্রদায় যেভাবে ইসলাম প্রচার করেছে এ দেশে, তা গোঁড়া সুন্নী আলেমদের মতো ছিল না। সুফীদের মরমিয়া রীতির সঙ্গে ভারতীয় তন্ত্রের সাযুজ্য সমাজে সুফী মতবাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই বাড়িয়ে তুলেছিল। সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার উদাহরণ দিতে গেলে সাহেব ধনী, সত্যনারায়ণী. মাইজভাণ্ডারী ও বাউল সম্প্রদায়ের কথা বলতে হবে। এই সম্প্রদায়গুলো যে হিন্দু-মুসলমানের ভেদরেখা তুলে দেওয়ার জন্য হার্দিকভাবে কাজ করেছেন, সেটা বলতে হবে। যে সময় বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা বহিরাগত তুর্কী, পাঠান, মোগলদের ছাড়িয়ে গেল, তখনই বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখক-কবিদের আবির্ভাব ঘটল।
ষোড়শ শতকে মুসলিম সমাজের স্তরবিন্যাসের বর্ণনা দিয়েছিলেন মুকুন্দরাম। সে স্তরবিন্যাসে যেমন বিত্তবান অভিজাত মুসলমানদের দেখা পাওয়া যায়, তেমনি দরিদ্র বৃত্তিজীবীদেরও দেখা যায়। সমাজের অভিজাতরা ছিলেন পাঠান, মোগল, তুর্কী, আরব। এরা তাদের সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফারসি ভাষাকে। বলা যায়, সুলতানি আমলের শুরু থেকেই ফারসি ভাষা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযোগ সেতু। সুলতানদের অনেকেই ছিলেন ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত। সমগ্র ভারতবর্ষেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সুপণ্ডিতেরা ফারসি ভাষায় অনেক বই লিখেছেন।
ফারসির ওই আধিপত্য চলেছে ঊনবিংশ শতকের গোড়া অবধি।
পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমরা যখন আমাদের আলোচনাকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, তখনও উর্দু বলে কোনো ভাষার সন্ধান মিলছে না। অথচ ভাষা প্রশ্নটি যখন এল, তখন বাংলা ও উর্দুই হয়ে উঠল মুল বিতর্কের বিষয়।
মুসলিম শাসনকালে হিন্দু সম্প্রদায়
জাহীদ রেজা নূর
হিন্দু কাকে বলা হয়? সিন্ধুতীরে যারা বসবাস করত, তারাই ছিল হিন্দু। প্রাচীনকালে হিন্দু ধর্ম বলে কোনো ধর্ম ছিল না। এ দেশের আদিম অধিবাসীরা কৌম ধর্ম পালন করত। পরে এসেছিল জৈন ধর্ম, আজীবিক ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম। এরপর এসেছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম। তাহলে হিন্দু ধর্মটা কী?
আগেই বলেছি, হিন্দু শব্দটি এসেছে সিন্ধু থেকে। এ দেশে যে মুসলমানেরা এসেছিল, তাদের মাতৃভাষা যা-ই হোক না কেন, তাদের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। ফারসি ভাষার একটা মজা আছে। এ ভাষায় ‘স’ নেই, আছে ‘হ।’ তাই সিন্ধু শব্দটি তাদের ভাষায় হয়ে গেল হিন্দু। অহমিয়া ভাষায়ও কিন্তু একই নিয়ম খাটে। আমরা বাংলায় বলি ‘আসাম’, কিন্তু অসমিয়া ভাষায় তা ‘অহম’। আমরা যে ফারসি ভাষার কথা বলছি, সেটা কিন্তু পারস্যে ‘পারসি’ ভাষা। কিন্তু আরবরা ‘প’ উচ্চারণ করে না, তাদের উচ্চারণে ‘প’ নেই। তারা পারসিকে উচ্চারণ করে ‘ফারসি’।
তাহলে সিন্ধু নদের তীরে যারা বসবাস করত, তারা হলো হিন্দু, হিন্দুস্তান বলতে শুরুতে বোঝানো হতো উত্তর ভারত, পরে সমগ্র ভারতবর্ষই পরিচিত হয় এই নামে। আর ইন্ডিয়া শব্দটিও এই উচ্চারণের ঘেরাটোপেই সৃষ্টি হয়েছে। ইন্ডিয়া শব্দটিও এসেছে সিন্ধু শব্দ থেকে। গ্রিকভাষায় সিন্ধু হয়ে গেছে ইন্দু। ইন্দু থেকেই এসেছে ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান।
মজা কারো আছে। এ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন মুসলমান হয়ে গেল, তখন হিন্দু বললে এই মুসলমানদের বোঝানো হতো না। হিন্দু তখন একটি বিশেষ সংস্কৃতির ধারকদের পরিচয়। একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়। এ দেশের সকল লোককে বোঝানো হতো হিন্দুস্তানি শব্দটি দিয়ে। তার মানে মুসলমান ব্যক্তিটিও হিন্দুস্তানি মুসলমান। পরে হিন্দু-মুসলমান বিষয়টি একেবারে রাজনৈতিকভাবে দুটি পরস্পর-বিবদমান সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে, যার আলোচনা এখানে নয়।
বিবাদের কথা বলার আগে সে সময় রাষ্ট্রের ক্ষমতা বণ্টনের বিষয়টি বলা দরকার। নইলে বোঝা যাবে না, কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা অগ্রসর মানুষ হিসেবে কোম্পানির শাসনামলেও এগিয়ে থাকল।
মধ্যযুগে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এমনটা বলা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাসের কারণে একধরনের একটা সম্পর্ক তো গড়ে উঠেছিলই। হিন্দু অভিজাতেরা তাদের নিজ স্বার্থেই মুসলমান শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। মুসলমান শাসকেরাও তাদের নিজ স্বার্থে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত করেছিলেন। রাজকার্য পরিচালনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, জালালুদ্দিন, রুকনদ্দিন বরবক শাহ, আলাউদ্দিন হোসেন শাহসহ বহু সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন।
বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করা যাক। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের প্রধান উজির ছিলেন ভাতুরিয়া পরগনার জায়গীরদার জগদানন্দ ভাদুড়ি। জালালুদ্দিুনের মন্ত্রী ছিলেন বৃহস্পতি মিশ্র। এই বৃহস্পতি মিশ্র ছিলেন লেখকও। ‘স্মৃতি রত্নাহার’সহ বেশ কয়েকটি বই লেখার জন্য সুলতান তাঁকে ‘রায়মুকুট’ উপাধি দেন। মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ লিখেছিলেন। সুলতান রুকনুদ্দিন বরবক শাহ তাতে খুশি হয়ে গুনরাজ খাঁ উপাধিতে ভূষিত করেন। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের উজির ছিলেন গোপীনাথ বসু ওরফে পুরন্দর খাঁ, দবীর খাস বা প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন সনাতন, মাকর মল্লিক রূপ, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস। আরেকটু গভীরে গেলে দেখা যাবে, গোবিন্দ দাসের মাহামহ দামোদর যশোরাজ খাঁ ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ কাব্যে এবং বিপ্রদাস পিলালাই ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে হোসেন শাহের নাম উল্লেখ করেছেন। হোসেন শাহের ছেলে নসরত শাহ কবিশেখর দেবকীনন্দন সিংহের পৃষ্ঠপোষককতা করেন। তাঁর পুত্র ফিরোজ শাহ শ্যিধরকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য। আর চট্টগ্রামে হোসেন শাহের সেনাপতি লস্কর পরাগল খাঁ কবীন্দ্র পরমেশ্বরকে দিয়ে মহাভারতের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করান। মুসলিম সুলতানদের রাজকার্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যোগ্যতামতো পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছেন। মুঘল শাসকদের সময় নবাবি আমলে মুর্শীদ কুলী খাঁ তাঁর দেওয়ানিতে সর্বাধিক সংখ্যক হিন্দু কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিনও এই পথ বেছে নেন। জগৎশেঠ ফতেহচাঁদ ছিলেন তাঁর অর্থ উপদেষ্টা। সে সময়ই ঢাকার দেওয়ান ছিলেন যশোবন্ত সিংহ।
আরো পরে সবাব সিরাজুদ্দৌলার অন্যতম সেনাপতি ছিলেন মিরমদন। তাঁর বিশ্বাসভাজন দেওয়ান ছিলেন মোহনলাল।
এতে মুসলিম শাসকেরা যেমন লাভবান হয়েছিল, সমাজে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কেও এসেছিল সৌহার্দ্য।
সংস্কৃতকে হটিয়ে বাংলা সাহিত্য
আমরা সকলেই জানি, মধ্যযুগে হিন্দুশাস্ত্রগুলো রচিত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। রেনেসাঁপূর্ব ইউরোপের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব, ইউরোপীয় দেশগুলোতেও তখন মাতৃভাষাকে খুব একটা পাত্তা দেওয়া হতো না। মুখের ভাষা যেন শুধুই মুখের ভাষা। লেখালেখি, বিজ্ঞাসসাধনা, সাহিত্যরচনা সবকিছুই করতে হবে সম্ভ্রান্ত ভাষায়। এ কারণে রেনেসাঁ-পূর্ব ইউরোপের ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডে লেখার ভাষা ছিল লাতিন। মৃত লাতিনেই বাঁধা ছিল শিক্ষা।
কিন্তু তাতে কি মন ভরে? ‘বিনা স্বদেশি ভাষা, মেটে কি আশা?’ আর সে কারণেই ইতালিতে দান্তে, পেত্রার্কেদের নেতৃত্বে যে পরিবর্তন এল, সেটাই বদলে দিল পুরনো পৃথিবীকে। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ বুঝিয়ে দিল মাতৃভাষার দিন এসে গেছে। এই ছিল শুরু।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে আমাদের ভূখণ্ডে। দেশি ভাষায় সাহিত্য কিংবা ধর্মচর্চার কথা ভাবতেই পারত না সেকালের মানুষ। অথচ দিব্যি কথা বলছে খাঁটি বাংলা ভাষায়। বাংলা ভাষা উপর মহলে জায়গা করে নেওয়ার পিছনে আছে দুটো ঘটনা। প্রথমটি হলো মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা, দ্বিতীয়টি শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব।
আগেই বলা হয়েছে, মুসলমান সুলতান কিংবা সুবাদার-নবাব এবং রাজকর্মচারীরা এসেছিলেন তাদের ধর্মের ভাষা ছিল আরবি এবং রাজকার্যের ভাষা ছিল ফারসি। দেশি মানুষেরাও রাজকার্যে স্থান পাওয়ার জন্য কিংবা আভিজাত্য লাভের জন্য ফারসি শিখে নিত। এখন যেমন ইংরেজি শিখে নেয়, তেমনি। কিন্তু স্থানীয় সাধারণ হিন্দুদের মতোই স্থানীয় সাধারণ মুসলমানেরা বাংলা ভিন্ন আর কোনো ভাষাই জানত না। সুলতানরা এই বৈপরীত্ম্যটা ধরতে পারলেন। শাসন করবেন দেশ, অথচ সে দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ হবে না, এ কেমন কথা? ফলে তারা নজর দিলেন বাংলা ভাষার দিকে। খুবই দরকারি কথা হলো, এই সুলতান, নবাবেরা বাংলায় এসে বাঙালির মতোই জীবনাচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন, মিশে গেলেন মূল জনস্রোতের সঙ্গে। নিজেদের আলাদা করে রাখলেন না।
মুসলমান শাসকেরা রামায়ন, মহাভারত, ভগবতের কথা শুনতে ভালো বাসতেন। তারাই এই গ্রন্থগুলোর বাংলা অনুবাদ করান। সুলতানরা বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এর প্রভাব এসে পড়ে স্থানীয় রাজা. জমিদার, সামন্তদের ওপরও। তারাও বাংলা ভাষায় কাব্যচর্চাকে উৎসাহ দেন। মাগন ঠাকুর আলাওলকে, কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদ আর ভারতচন্দ্রকে, কাশীজোড়ের জমিদার লক্ষ্মীনারায়ণ বলরাম চক্রবর্তীকে, কর্ণগড়ের রাজা যশোবন্ত সিং রামেশ্বর ভট্টাচার্যকে, আড়বার রঘুনাথ রায় কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে বাংলা ভাষায় কাব্য রচনায় উৎসাহ দেন। ফলে সাহিত্যের ধারা অনুযায়ী অনুবাদ সাহিত্যে সমৃদ্ধ হলো বাংলা এবং মৌলিক রচনাও জায়গা করে নিল বাংলা সাহিত্যে।
বড়ু চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতির রচনা সে সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বড়ু চণ্ডীদাস তাঁর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ লিখলেন, যার কেন্দ্রে রইলেন রাধা-কৃষ্ণ। চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে বৈষ্ণব ধর্মও মানুষের মন ছোঁয়। চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাসেরা সমৃদ্ধ করে তুলতে থাকেন বাংলা সাহিত্য। এরপর মঙ্গলকাব্যগুলো রচিত হতে থাকে। মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, চৈতন্যজীবনীকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ঋদ্ধ হতে থাকে।
এখানেই মনে করিয়ে দিতে হবে, এ সময়টিতে বাংলার জনগণের অর্ধেক মুসলমানে পরিণত হয়েছে। মুসলমান সুলতানেরা সাহিত্যকর্মে উৎসাহ দিলেও মধ্যযুগে মুসলমান কবির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কেন কম? ভাষা আন্দোলন নিয়ে কথা বলার সময় এই কারণটির দিকে রাখতে হবে নজর। আমরা জানি, শাস্ত্রকথা বাংলায় লেখা হলে তাতে চটে উঠেছিল ব্রাহ্মণরা। দুর্বোধ্য, নাগালের বাইরের সংস্কৃতভাষার কারণে শাস্ত্রের প্রতি তাদের দখল ছিল একচেটিয়া। কিন্তু বাংলা ভাষায় তা অনুবাদ করার ফলে যে কেউ এখন শাস্ত্র পড়তে পারে নিজ ভাষায়! বাঙালি মুসলমানদের ছিল আরেক সমস্যা। তারা ধরেই নিয়েছিল শাস্ত্রের ভাষা, ধর্মের ভাষা বাংলা হতে পারে না। কারণ, বাংলা ‘হিন্দুয়ানি’ ভাষা। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব চলেছে সতের শতক অবধি। এই কারণে আমরা মুসলিম কবি-লেখকদের রচনায় দেখতে পাব কৈফিয়তের সুর। কেন তারা বাংলা ভাষায় লিখতে চান, তা নিয়ে নিজেরাই নিজেদের প্রবোধ দেন, অন্যকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। সে বিষয়েই আমরা কথা বলব এবার। জানাব কী বলছেন শাহ মুহম্মদ সগীর, কী বলছেন সৈয়দ সুলতান, কী বলছেন হাজী মুহম্মদ, কী বলছেন আবদুন্নূর।
আর এই কথাগুলোই আমাদের নিয়ে আসবে আটচল্লিশ এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের কাছে। বাঙালি মুসলমানের মন বোঝার জন্য এই আলোচনাটা হয়ে উঠবে জরুরি।
সমন্বয় এবং বিচ্ছেদ
হিন্দু ও মুসলিমের মধ্যে সংঘাত হওয়ার ছিল দুটো কারণ। একটি ধর্মীয়, অন্যটি সামাজিক। এই দুটি বিষয়ই হিন্দু ও মুসলমান লেখকদের লেখার মধ্যে বৈরিতা নিয়ে আসে। বিদ্যাপতি মুসলমানদের ‘তুরক’ নামে অভিহিত করেছেন। তুর্কি মুসলমানরাই প্রথম এদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু এরপর আরব, ইরানি, আফগানিরা এসেছে। কিন্তু হিন্দুদের চোখে এরা সবাই বিদেশী, বিধর্মী, বিজাতি, বিভাষী। ধর্মান্তরিত হয়ে যারা মুসলমান হয়েছে, তারাও হিন্দুদের চোখে বিদেশী। বিদ্যাপতি বলেছেন, ‘হিন্দু তুরক মিলল বাস,/একক ধর্ম্মে অওকো উপহাস/কতহু বাঙ্গ কতহুঁ বেদ/কতহুঁ মিলমিশ কতহুঁ ছেদ (এখনকার বাংলায় হিন্দু তুর্কি একসঙ্গে বাস করে। একের ধর্মে অন্যে উপহাস করে। কেউ আজান দেয়, কেউ বেদ পড়ে)।
নানা কারণেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠেনি। বৈরি পরিবেশে এগিয়েছে সমাজ। ফলে দুই ধর্মের কবি-সাহিত্যিকদের একটকা বড় অংশ পরষ্পরকে খাটো করে রচনা করেছে তাদের সাহিত্য। হিন্দুদের লেখায় মুসলমানদের নাকানি-চুবানি খাওয়ানো হয়েছে। এমনকি মনসামঙ্গলেও অনুপ্রবেশ করেছে মুসলমানেরা, যারা মনসার পুজা দেবে না বলে জানিয়ে দেয়, কিন্তু বিপাকে পড়ে তাদের মনসাদেবীর পুজা করতে হয়। এমনকী সম্রাট জাহাঙ্গীরও অন্নদার শ্রেষ্ঠত্ব শিকার করে নেন বলে কাল্পনিক কাহিনী গড়ে উঠেছিল। এই কাহিনীগুলোয় একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। মধ্যযুগের সাহিত্যে মুসলমান কর্তৃক হিন্দুদের ওপর চালানো অত্যাচারের যে বর্ণনা আছে, তাতে দেখা যায় মুসলমান শাসক বা রাজ কর্মচারীরাই এইসব অত্যাচারের জন্য দায়ী। সাধারণ মুসলমানেরা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করছে, এ রকম উল্লেখ পাওয়া যায় না। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, হিন্দু রাজা-সামন্ত-জমিদারেরাও একইভাবে প্রজাদের ওপর অত্যাচার চালাত। হিন্দু রাজকর্মচারীরাও হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করত। কিন্তু রাজ্যের শাসনক্ষমতা মুসলমানের হাতে হওয়ায় সব দোষ গিয়ে পড়ত শাসকের ওপর।
মঙ্গলকাব্যে যেমন মনসা, চণ্ডী, ধর্ম, শিব অর্থাৎ হিন্দু দেবদেবীদের গূণকীর্তন করা হয়েছে, তেমনি মুসলমান সাহিত্যেও উঠে এসেছে মুসলিম বীরপুরুষদের কাহিনী। কবি ফকিরউল্লাহ লিখেছিলেন ‘সোনাভান।’ তিনি তাঁর পুঁথিতে লিখেছিলেন, হিন্দু সোনাভানকে পরাজিত করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করানোর জন্য আরব থেকে বীর হানিফা আসে। কিন্তু সোনাভানের কাছে হানিফা পরাজিত হয়। সোনাভান হানিফাকে বলির উদ্দেশ্যে দেবতা শিব ও দেবী কালির কাছে উপস্থিত করে। কিন্তু শিব হযরত মুহাম্মদ (স.) ও হযরত আলীকে শ্রদ্ধা করেন, আলীকে ভয় পান কালীও। তাই বধ করা তো দূরের কথা, হানিফার জন্য সোনাভানকে উপদেশ দেন শিব: ‘ইহাকে খাইতে দেহ যাহা খেতে চায়/ইহাকে মারিতে পারে কে আছে দুনিয়ায়।
এ রকম যে কথার যুদ্ধ চলছে দুই ধর্মের কবি-সাহিত্যিকের মাঝে, তা কিন্তু চলছে বাংলা ভাষায়। বাংলা ভাষা এদের দ্বারাই সমৃদ্ধ হচ্ছিল। এবং এরই পাশাপাশি দেখা যাচ্ছিল সমন্বয়ের চিন্তা। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের কবিরা সত্যপীরের পাঁচালী রচনা করেছেন। শেখ ফয়জুল্লা তাঁর পাঁচালীর শুরুতে লিখেছেন,‘তুমি ব্রহ্মা, তুমি বিষ্ণু, তুমি নারায়ণ/শুন গাজী আপনি আসরে দেহ মন।’ বিজয়গুপ্তের পদ্মপূরাণে এবং কেতকাদাস ক্ষেমনন্দের ‘ক্ষমানন্দ’তে চাঁদ সদাগর লক্ষ্ণীন্দরের বাসরে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে মুসলমানদের কোরআনও রেখেছেন। কৃষ্ণরাম দাস সপ্তদশ শতকে তাঁর রায়মঙ্গল কাব্যে এমন এক দেবতার কথা লিখেছেন, যার এক হাতে কোরআন, অন্য হাতে পুরান।
মলুয়ার পালার গীতিকার কী বলছেন, তা শোনা যাক। ‘হেঁদু আর মোছলমান একই পিণ্ডির দড়ি/কেন আল্লা বলে আর কেহ বলে হরি/বিসমিল্লা আর ছিরিবিষ্টু একই গেয়ান/দোফাক করি দিয়ে পরভু রাম রহিমান।’
এতকিছু সত্ত্বেও এই সমন্বয় সামাজিক জীবনে খুব একটা কাজে আসেনি। জীবনের ন্যূনতম ক্ষেত্রে হলেও তারা ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মেনে চলেছে। আর তাই সত্যপীর ও সত্য নারায়ণ অভিন্নসত্ত্বার প্রতীক হলেও মুসলমানের কাছে সে সত্যপীর হয়ে থেকেছে, আর হিন্দুর কাছে সে হয়েছে সত্য নারায়ণ।
কিন্তু বাংলার বাউল সম্প্রদায় কখনোই শাস্ত্রীয় আচার-আচরণের কাছে মাথা নোয়াননি। আমরা লালন দিয়ে শুরু করব পরের লেখাটি।
বাউল গান ও মুসলিম মনে দ্বিধা
সমাজে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল, আবার মিলনের আকাঙ্ক্ষাও ছিল। তারই প্রকাশ দেখা গিয়েছিল বাউলগানে। বাউল গানে আমরা একটু থামব এই কারণে যে, মানুষকে সম্মান করার ভিত্তিভুমি সেখানে পাওয়া যায়। যে কোনো ধর্মের মানুষই যে সম্মান পাওয়ার যোগ্য, সে কথা ছড়িয়ে আছে বাউল গানে, বাউল শরীরে, বাউল অন্তরে।
মন্দির আর মসজিদ পরষ্পরের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করলে তা স্পর্শকাতর মানুষকে মর্মাহত করেছিল। কিন্তু সে সংঘাত চলমান থেকেছে এবং আজও তা আমাদের সমাজের শরীরে বিষফোঁড়া হিসেবে অবস্থান করছে। বাউলরা সেই ভেদাভেদ ভুলে যেতে বলে যাচ্ছেন কতদিন ধরে। বাউল কবি বলছেন, ‘তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজিদে/তোমার ডাক শুনি সাঁই চলতে না পাই/রুখে দাঁড়ায় গুরুতে মুরশেদে।’ ‘মনের মানুষ’ মানে পরমাত্মা, সে তো বাস করে মানুষেরই অন্তরে। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলনের পথটি তাই সহজ মানুষ খুঁজে পায়। লালনের জানা গানগুলোর কয়েকচরণ উদ্ধৃত করলেই তা বোঝা যাবে: সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারেতে?/লালন বলে, জাতের কি রূপ দেখলাম না দু চোখেতে।’ কিংবা ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখী/কমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মন বেড়িখান/দিতাম তাহার পায়।’
বাউল গান নিয়ে কথা বলতে গেলে স্মরণ নিতে হয় রবীন্দ্রনাথের। তিনি লিখলেন, ‘আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন, তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন।…বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনায় দেখি—এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েই, একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি।…এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরান-পুরানে ঝগড়া বাধেনি।’ কথাগুলো তিনি লিখেছিলেন মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের বাউল-গানের সংগ্রহ ‘হারামনি’র প্রথমভাগের ভূমিকায়।
দুই ধর্মের মিলনের এই চেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি। আজও আমাদের দেশে বাউলবিরোধীতা রয়েছে। আমাদের শিকড়ের সন্ধান করে না বলেই ধর্মান্ধরা বাউলদের অত্যাচার করে।
বাঙালি মুসলমান মধ্যযুগে বাংলাতেই লেখা শুরু করেছিল পুঁথি। সরল বাংলা আয়ত্ব করেছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু শুরুতে বাংলা ভাষা নিয়ে যে দ্বিধা-সংশয় ছিল তাদের মনে, সে কথাও এই আলোচনায় আসা দরকার। মনে করিয়ে দিই, আমরা যখন ভাষা আন্দোলনের ঘটনাগুলো বলব, তখন এই তথ্যগুলো আমাদের জানিয়ে দেবে, কেন মুসলমানের মনে বাংলা ভাষা নিয়ে দ্বিধা ছিল, এবং কোন শক্তিতে সেই দ্বিধা কাটিয়ে উঠল তারা। জানিয়ে দেবে, বাঙালি মুসলমানদের অভিজাতশ্রেণীর কাছে বাংলা কেন সমাদর পায়নি, কের উর্দুর প্রতি ছিল তাদের ভালোবাসা।
সে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা বাংলা নিয়ে বাঙালি মুসলমানের মনের সে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলব। মুসলমান হিসেবে আরব-পারস্যের সঙ্গে একটি আন্তরিক যোগ অনুভব করেছে বাংলার বাঙালিরা। আবার এ দেশের অন্নে তারা লালিত হয়েছে। এই দুই ধারার দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ আরবি-ফারসি জানত না। তাদের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। ফলে বাংলার কবিরা বাংলায় লেখালেখি করার সময় কৈফিয়ত দিতে শুরু করলেন। কবি সৈয়দ সুলতান ‘ওফাতে রসুল’ বইয়ে লিখলেন, ‘বঙ্গদেশী সকলেরে কিরূপে বুঝাইব/বাখানি আরব ভাষা এ বুঝাইতে নারিব।/যারা যেই ভাষে প্রভু করিছে সৃজন/সেই ভাষ তাহার অমূল্য সেই ধন।’
চট্টগ্রামের কবি বদিউদ্দিন ‘ছিফতে ঈমান’ নামের বইয়ে লিখলেন, ‘দিন ইসলামের কথা শুন দিয়া মন/দেশী ভাষে রচিলে বুঝিব সর্বজন।
শাহ মুহাম্মদ সগীর (১৩৮৯–১৪১০) লিখছেন: নানা কাব্য–কথা–রসে মজে নরগণ/যার সেই শ্রদ্ধাএ সন্তোষ করে মন।/না লেখে কিতাব কথা মনে ভয় পায়/দুষিব সকল তাক ইহ না জুয়ায়।/গুনিয়া দেখিলুঁ আহ্মি ইহ ভয় মিছা/না হয় ভাষায় কিছু হএ কথা সাচা।’
সপ্তদশ শতকের আবদুন নবী, যিনি আমীর হামজা লিখেছিলেন, তাঁর কথাও শুনি:
মুসলমানী কথা দেখি মনেহ ডরাই/রচিলে বাঙ্গালা ভাষে কোপে কি গোঁসাই/লোক উপকার হেতু তেজি সেই ভয়/দৃঢ়ভাবে রচিবারে ইচ্ছিল হৃদয়।’
এ থেকে বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষায় লেখালেখির ব্যাপারে মনের দ্বন্দ্বটা পরিস্কার বোঝা যায়। এরপর ব্রিটিশ যুগে মুসলমান মন নিয়ে কিছু কথা বলে আমরা ঢুকে পড়ব দেশভাগের সময়টায়। তাহলেই বাংলা-উর্দুর সংঘাতটি উপলব্ধি করা যাবে।
৯ ফেব্রুয়ারি ছাপার জন্য
ফারসি ভাষা শিখল কারা?
উর্দু আসার আগে এ অঞ্চলে আরবি এবং ফারসি ছিল দামি ভাষা। মুসলিম শাসনামলে ভালো রাজ চাকরি পাওয়ার জন্য ফারসি জানা খুব জরুরি ছিল। ভাষাটি রপ্ত করার জন্য মুসলমানরা যতোটা চেষ্টা করেছে, হিন্দুরাও ততোটা বা তারচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছে। ফলে রাষ্ট্রের চাকরিগুলি পাওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সে আমলেও এগিয়ে ছিল।
মধ্যযুগে মুসলমান শাসকদের আমলে মুসলমানদের অবস্থা ভালো ছিল আর ইংরেজরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার পর থেকেই মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছে, এটা ভুল ধারনা। মধ্যযুগেও গরিব মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। মুসলিম শাসকেরা কৃষকের মুখ চেয়ে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করেনি। কৃষি বা শিল্পে এমন কোনো অবদান রাখেনি, যাতে সাধারণ গরিব মানুষের মুখে হাসে ফোটে। সামন্ততান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থায় প্রজার কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা আর বিলাসিতায় গা ভাসানোর প্রবণতা ছিল। শাসকদের ছত্রছায়ায় যে অভিজাতশ্রেণী গড়ে উঠেছিল, তারাও সাধারণ মানুষকে শোষণ করে আয়েশী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এই অভিজাতশ্রেণীর মধ্যে মুসলমানরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল হিন্দুরাও। এবং খুবই তাৎপর্যময় তথ্য হলো, মুসলিম শাসনের শেষের দিকে মুসলিম অভিজাতদের তুলনায় হিন্দু অভিজাত পরিবারের সংখ্যা বেশি ছিল।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরও সাধারণ মুসলমানদের জীবনযাত্রা বদলে যায়নি। আগে যে কাজ করতেন তারা, সে কাজই করতেন ধর্ম পরিবর্তন করার পরও। সে সময় সার্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। রাজপরিবারের সন্তানদের ছিল গৃহশিক্ষক। ধনী ব্যক্তিরাও সন্তানদের জন্য গৃহশিক্ষক রাখতেন। পাঠশালায় বাংলা পড়ানো হতো। কিন্তু সেখানে মূলত হিন্দুরাই যেত। কারণ পাঠশালার বইয়ে হিন্দু পুরাণের কথা স্থান পেত। কেন মুসলমানের সন্তানরা সেগুলো পড়বে? তাছাড়া বাংলা শিখে তো রাজকার্য পাওয়া যাবে না। কেন মিছিমিছি বাংলা পড়বে তারা?
টোল আর চতুষ্পাঠী ছিল হিন্দু শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জায়গা। এই দুই বিদ্যায়াতনে শিক্ষা দেওয়া হতো সংস্কৃতের মাধ্যমে। মুসলমানদের জন্য ছিল মক্তব আর মাদ্রাসা। সেখানে ভাষা ছিল আরবি আর ফারসি।
যদি মক্তব মাদ্রাসায় আরবি আর ফারসি পড়ানো হয়, তাহলে বাংলার মুসলমানের সন্তানদেই তো বেশি বেশি রাজকার্যে নিয়োগ পাওয়ার কথা! এখানে দুটো বিষয়ে জানানো দরকার। মক্তব মাদ্রাসায় যে আরবি আর ফারসি পড়ানো হতো, তা ছিল অনেকটা মুখস্তবিদ্যার মতো। ঠিকভাবে শেখা হতো না। রাজকার্য পেতে হলে ফারসি জানতে হবে। তাই হিন্দুদের শিক্ষার জন্য আলাদা ‘পার্সি’ স্কুলের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যেখানে পার্সি স্কুল ছিল না, সেখানে হিন্দু সন্তানেরা মাদ্রাসাতেও যেত ফারসি শেখার জন্য। নবাবী আমলে মুসলমানদের তুলনায় ফারসি-জানা হিন্দুরা রাজকার্যে বেশি যোগ দিত।
কোম্পানি শাসনের আমলে লর্ড বেণ্টিংক-এর সময় থেকে নথি হাজির করা যাক। তাঁর শাসনামলে উইলিয়াম অ্যাডাম বাংলা ও বিহারের ‘স্বদেশী শিক্ষাব্যবস্থা’ সম্পর্কে তিনটি রিপোর্ট (১৮৩৫-১৮৩৮) পেশ করেছিলেন। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদ জেলায় বাংলা স্কুলে মোট ১০৮০ জন ছাত্রের মধ্যে হিন্দু ছাত্রের সংখ্যা ৯৯৮ জন। ৮২ জন ছিল মুসলিম ছাত্র। আর আরবি ফারসি স্কুলে ছাত্রদের অবস্থান? ১০৯ জন ছাত্রের মধ্যে ৬২ জন হিন্দু এবং ৪৭ জন মুসলমান। বলাই যায়, বাংলা শিক্ষায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে তো ছিলই, এমনকি আরবি ফারসিতেও তারা মুসলমানদের থেকে এগিয়ে ছিল।
তাহলে বলাই যায়, রাজভাষা শিক্ষায় হিন্দুরা মুসলমানদের থেকে এগিয়ে ছিল বলে রাজকার্যেও তারা ছিল এগিয়ে। বলা যায়, পলাশী যুদ্ধের কিছুকাল আগে থেকে বাংলার জমিদারী, রাজস্ক বিভাগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মহাজনী কারবারে হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। শুধু বিচার বিভাগ আর সামরিক বিভাগে মুসলমানরা এগিয়ে ছিল। কোম্পানি শাসনের সময় কীভাবে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়ে কথা বললেই বোঝা যাবে মুসলমানদের উর্দুপ্রীতির কারণ। কোম্পানির কর্মকর্তারা কীভাবে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জন্ম দিল, সেটাই হবে পরবর্তী আলোচনার বিষয়।
পিছিয়ে পড়া মুসলমান
নবাবী আমলের শেষভাগেই হিন্দুদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যবসা-বাণিজ্য আর জমিদারিতে। তবে অভিজাতশ্রেণীর মুসলিমরা ছিলেন প্রশাসনের উচ্চপদে। সেনাদল আর বিচারবিভাগে ছিল তাদের প্রাধান্য। কিন্তু কোম্পানির শাসনের সময় মুসলমানেরা এইসব পদ থেকে বিতাড়িত হলো। নবাবী আমলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জমিদার ছিলেন। কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করেছিল ১৮৬৫ সালে। বেশি বেশি রাজস্ব আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করল তারা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গেলেও রাজস্ব আদায় করা হলো নির্দয়ভাবে। জমিদারেরা রাজস্বের এই চাপের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারল না। ১৭৭২ সালে নিলামের মাধ্যমে রাজস্ব নির্ধারণ নীতি প্রবর্তন করা হলো। নব্য বণিক শ্রেণী নিলামে জমিদারী কিনে নিতে লাগলেন। নতুন এই জমিদারশ্রেণীর অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায় থেকে এল।
পলাশী যুদ্ধের কারণে মুসলিম সৈন্যদের ব্যাপারে সন্দেহ জাগে ইংরেজদের মনে। তারা অভিজাত মুসলমানদের দিক থেকে বিপদের আশঙ্কা করেন। তাই কোম্পানির সেনাদলে মুসলমানরা আর থাকল না। রাজস্ব বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ থেকেও ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হতে থাকল মুসলমানদের।
এবার দেখা যাক, সে সময়ের চিত্রটা। জমিদারি থেকে হটে গেল মুসলমানেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য থাকল না তাদের হাতে, সেনা দল, শাসন ও বিচার ব্যবস্থায়ও তারা নেই। ফলে ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও সেভাবে অনুভব করেনি তারা। তারচেয়ে বড় কথা, সে উপায়ও ছিল না মুসলমানদের। শুধু অভিমান করে ইংরেজি শেখেনি মুসলমানেরা, সেটা সত্য নয়। ইংরেজি শেখার মতো অবকাঠামো ছিল না তাদের। কোম্পানি যখন নিজ হাতে তুলে নিল শাসনভার, তখন তারা এই দেশের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবেনি। কোম্পানির কর্মচারীদের দালালি-দেওয়ানি-বেনিয়ানি ও সরকারি মুৎসুদ্দীগিরি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে। তারা ইংরেজি শিখে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল। ইংরেজদের সহযোগিতায় তারা খুলে ফেলল হিন্দু কলেজ। সে সময় ইংরেজি স্কুল বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মিশনারী আর সম্ভ্রান্ত হিন্দুদের দ্বারা। কলকাতা বা শহরাঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল কম। গ্রামেই বাস করত অধিকাংশ মুসলমান। ইংরেজি স্কুলগুলো গড়ে উঠছিল কলকাতা ও তার নিকটবর্তী শহরাঞ্চলে। পূর্ব বাংলা ও উত্তর বাংলায় মুসলমানরা ছিল বেশি। সে এলাকার হিন্দু জমিদারেরা কর আদায় করতেন গ্রামাঞ্চল থেকে কিন্তু বসবাস করতেন কলকাতায়। ফলে নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে ইংরেজি স্কুল গড়ার কথা ভাবেননি তারা। নিদারুল দারিদ্র মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। ইংরেজরা যদি সাধারণ মানুষের জন্য ইংরেজি শিক্ষার আয়োজন করত, তাহলে মুসলিমরা পিছিয়ে পড়ত না।
ইংরেজি শিক্ষায় পিছিয়ে পড়লে সরকারি চাকরি পাওয়া যাবে না। আদালতে যতদিন ফারসি ভাষা চালু ছিল, ততদিন কিছুসংখ্যক মুসলমান সরকারি চাকরি করতে পেরেছে। ইংরেজি প্রবর্তিত হওয়ার পর তাদের জায়গা দখল করে নিয়েছিল ইংরেজি জানা হিন্দুরা।
১৮৪৪ সালে অফিস-আদালতে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি ও বাংলা ভাষা চালু হলো। ইংরেজি এবং বাংলা—উভয় ভাষাতেই মুসলমানেরা পিছিয়ে ছিল। ফলে সরকারি চাকরি তাদের কাছে হয়ে উঠল সোনার হরিণ।
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর অভিজাত মুসলমানেরা শাসিত শ্রেণীতে পরিণত হলো, অভিজাত হিন্দুর কেবল শাসক পরিবর্তন হলো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এ সময় ইংরেজদের সহায়তায় হিন্দু সম্প্রদায় প্রাক্তন মুসলিম শাসকদেরকে অত্যাচারীরূপে চিত্রিত করতে থাকল। তারা বলতে লাগল, মুসলিম শাসকরা তাদের ওপর অত্যাচার করা শুরু করলে ইংরেজরা এসে তাদের বাঁচিয়েছে। এ সময় হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ ফুলে ফুঁপে ওঠে। হিন্দুত্ব-প্রীতি হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক। হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা হয়। সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষ দেখা যায়। গোরক্ষা আন্দোলন, শিবাজি উৎসব ইত্যাদির কারণে মুসলমান ও হিন্দুর সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে।
তবে মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। ১৮৫৮ সালে এদেশে প্রথম স্নাতক হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্ত্র চট্টোপাধ্যায় এবং যদুনাথ বসু। ১৮৬১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রথম মুসলমান হিসেবে স্নাতক হন দেলওয়ার হোসেন আহমদ।
আমরা আমাদের আলোচনায় রাজনৈতিকভাবে হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের কথা বলিনি। রাজনীতি যে পথে এগিয়েছে, তাতে ধীরে ধীরে হিন্দু এবং মুসলমান হয়ে উঠল পরষ্পরের ঘোরতর শত্রু। একটি দেশে তারা আর বাস করতে পারল না। দেশবিভাগের সেই কথাই এবার বলা হবে। এবং দেখা হবে বাংলার মুসলমানের কাছে উর্দু কতোটা দামি হয়ে উঠতে পেরেছিল, সেটাও।
বাংলা-উর্দু বিতর্ক
বাঙালি মুসলমান দীর্ঘকাল নিজেকে বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হয়নি। হতে চায়নি। হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের কথা আমরা বলেছি। এই দুই সম্প্রদায়ই পরষ্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়েছে। আবার গ্রামের দরিদ্র হিন্দু-মুসলমান তাদের আচার-ধর্ম পালন করে গেছে নিজেদের মতো করেই। রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ও তারা ছিল নির্বিকার।
এবার বাঙালি মুসলমানের মনোভঙ্গীর দিকে তাকানো যাক। বাঙালি মুসলমান তার আত্মপরিচয়ের সন্ধানে কল্পনার জগত ভ্রমণ করতেই পছন্দ করেছে বেশি। বাঙালি হিন্দু নিজেদের হিন্দু পরিচয়ের পরও বাঙালি পরিচয়কে বড় করে দেখত। বাঙালি মুসলমান নিজেকে খুঁজেছে বহিরাগত মুসলিমদের মধ্যে। নিজেরা এই মাটির সন্তান হলেও তারা ভেবেছে, তাদের শেকড় এখানে নয়, শেকড় আছে আরব বা ইরানে। নিজেদের মাটি-বিচ্ছিন্ন ভাবার কারণে তারা এই দেশের ইতিহাসে আত্মপ্রতিষ্ঠ হতে চেষ্টাও করেনি। আমরা বাংলা শাসন করা মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি কি খুব একটা খুঁজে পাচ্ছি? বাঙালি মুসলমান কি মসনদে বসার চেয়ে বহিরাগত এবং পরে বাঙালিদের সঙ্গে মিশে যাওয়া মুসলমান শক্তির ওপরই বেশি নির্ভর করেনি? ফলে সুষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে বাঙালি মুসলমানকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।
দীনতা ছিল বাঙালি মুসলমানের। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আশপাশে বাঙালি মুসলমান যায়নি বা যেতে পারেনি। তাদের মূল আবাসস্থল ছিল গ্রামে। কিন্তু বাঙালি বলে তাদের গোষ্ঠীচেতনা জন্মায়নি। তাই বাঙালি মুসলমান তার মুসলমান পরিচয় নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল, বাঙালি পরিচয়টি তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস লিখতে গেলে অবাঙালি আরব-ইরান-তুরস্ক থেকে আগত মুসলমানদের ইতিহাসই লেখা হয়েছে। সে সময় বাঙালি হওয়াটাকেই তারা অপরাধ বলে মনে করেছে। সাহিত্যকর্ম করতে গিয়েও বাঙালি মুসলমান চেষ্টা করেছে আরব বা ইরানের প্রচলিত কিংবদন্তীর শরণাপন্ন হতে। বাঙালি মুসলমানের আরেকটি প্রবণতা প্রবলভাবে ছিল, এখনও আছে। তারা নিজেদের আরব বা ইরানিদের উত্তরপুরুষ বলে ভাবতে স্বচ্ছন্দবোধ করে। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, খানদান বলতে বহিরাগত সংস্কৃতির ধারক বাহকদেরকেই বোঝা হতো। বাঙালি পরিচয় যেন গ্লানিকর। হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্মের আগ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান তার মুসলমান পরিচয়ের পাশাপাশি বাঙালি পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেনি।
পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে একই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার পরই বাঙালি মুসলমান নিজের বাঙালি পরিচয়ের দিকে নজর দিল। ওরাও মুসলমান, আমরাও মুসলমান। কিন্তু ওরা শোষক, আমরা শোষিত—এই উপলব্ধি যখন এল, তখন থেকেই বাঙালি মুসলমান তার নিজস্ব মাটিতে ফিরে আসা শুরু করল। আর তখনই জেগে উঠল জাতীয়তাবোধ। ধর্মীয় পরিচয় ভেদ করে বেরিয়ে এল তার জাতীয়তার পরিচিতি। এই বিন্দুতে দাঁড়িয়েই ভাষা আন্দোলনকে দেখতে হবে।
আরবি-উর্দু-বাংলা—এই তিন ভাষা নিয়ে সংশয়ে পড়েছিল বাঙালি মুসলমানেরা। একটা সময় পর্যন্ত বাংলা যে মাতৃভাষা হতে পারে, সে কথা তারা ভাবতেও পারেননি। উর্দুই হবে মাতৃভাষা এবং জাতীয় ভাষা, এ রকমই ছিল তাদের অভিমত। আর আরবি হবে ধর্মীয় ভাষা। জীবিকার প্রয়োজনে ইংরেজিকেও তারা ঠাঁই দিয়েছিলেন ভাবনায়। কিন্তু বাংলাকে নয়। এই ত্রিধারার ঘুর্ণীতেই আসলে ভাষা প্রসঙ্গটি জোরদার হয়ে ওঠে।
উর্দুকে বাঙালি মুসলমানের ঘরে প্রতিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্র কিন্তু শুরু হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই। তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ বলেছিলেন, ‘কোনো দেশের বা প্রদেশের মুসলমানদিগের দ্বারা কথিত ভাষা সেইসকল স্থানীয় মুসলমানদিগের জাতীয় ভাষা বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না। মুসলমানদিগের জাতীয় ভাষা যে আরবি, এ কথা ভুলিলে মুসলমানের সর্বনাশ হইবে।’ এর প্রতিবাদে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘জাতি অর্থ কোনো বিশিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায় নহে।…এই হিসাবে বাঙ্গালা ভাষা বাঙ্গালা দেশের সমগ্র অধিবাসীর জাতীয় ভাষা।…আমরা আরবি ভাষাকে আমাদের ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ বলিতে কিছুতেই রাজি নহি।’ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক মুসলমান ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা কেবল ছাত্র নও, তোমরা বাঙালি। তোমরা বাঙালি মুসলমান।’ নূর পত্রিকার সম্পাদকীয়টি দেখলেও বোঝা যাবে, ভাষা প্রসঙ্গটি তখন কতটা বিতর্ক তৈরি করেছিল। লেখা হচ্ছে সে সম্পাদকীয়তে, ‘বাঙ্গালার মাটি হইতে উর্দুকে নির্বাসিত করিতে না পারিলে বাঙ্গালা ভাষা বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারিবে না। মাতৃভাষার বিপুল ও তুমুল চর্চা ব্যতীত কোনও জাতির মুক্তি ও কল্যাণ লাভ কদাপি সম্ভবপর নহে। ’
(বক্তব্যগুলো আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক লিখিত ‘ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য’ বই থেকে নেওয়া)।
পাকিস্তার প্রতিষ্ঠার আগেই ভাষা বিতর্কের শুরু
বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটতে থাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। সে সময় পাটের ব্যবসা লাভজনক হয়ে উঠেছে। কৃষকেরা বাড়তি কিছু অর্থের মুখ দেখেছেন। ফলে কৃষক সন্তানেরা পড়াশোনার জন্য শহরাঞ্চলে আসতে থাকেন। শিক্ষিত মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
উদীয়মান বাঙালি মুসলমানের যে অংশটি সাহিত্য-সাংবাদিকতায় আসে, মূলত তাদের মধ্যেই ভাষা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তখন। মনে রাখতে হবে, সে সময় এই শিক্ষিত মুসলমানের বেশিরভাগই এসেছিলেন সাধারণ মুসলিম পরিবার থেকে, অভিজাত পরিবার থেকে নয়।
তখন থেকেই ভাষা-প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে থাকে মানুষ। অভিজাতশ্রেণীর উর্দুপ্রীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় সাধারণ মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ। এ ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায় হুমায়ূন আজাদের লেখা ‘বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র’ বইটি থেকে। এই আলোচনায় ভাষা-বিষয়ক এমন কিছু দিক উঠে এসেছে, যা পরবর্তীকালে ভাষা নিয়ে লড়াই করা মানুষের মানসগঠনে সহায়ক হয়েছে। ভাষা-প্রশ্নটি যে হঠাৎ করে হাজির হয়নি, বরং বহুদিনের বিতর্কের নির্যাস, সে কথা বুঝতে পারলেই ভাষা আন্দোলনের মহত্ব উপলব্ধি করা যাবে। কেন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে জড়িয়ে গেল আপামর বাঙালি জাতি, সে কথা বোঝা সহজ হবে।বাংলা পত্র-পত্রিকায় বাংলা ভাষার পক্ষে যে সব যুক্তি দেওয়া হচ্ছিল, আজ তাহলে সেগুলোই দেখা যাক:
ক. আমাদের বঙ্গীয় মুসলমানের কোনো ভাষা নাই। শরিফ সন্তানেররা ও তাহাদের খেদমতকারগণ উর্দু বলেন, বাঙ্গালা ভাষা ঘৃণা করেন। কিন্তু সেই উর্দু জবানে মনের ভাব প্রকাশ করা দূরে থাকুক, পশ্চিমা লোকের গিলিত, চর্বিত শব্দগুলিও অনেকে যথাস্থানে শুদ্ধ আকারে যথার্থ অর্থ প্রয়োগ করিতেও অপারগ। অথচ বাঙ্গালায় মনের ভাব প্রকাশ করিবার সুবিধা হইলেও ঘৃণা করিয়া তহা হইতে বিরত হন। সতেজ স্বাভাবিক বাংলা ভাষা স্বাধীনতা পাইলে তৎসঙ্গে পল্লীবাসী মুসলমান সমাজের উন্নতির যুগান্তর উপস্থিত হইবে।
( নূর অল ঈমান, ১: ৩. ১৩০৭)
খ. আমাদের পূর্ব পুরুষগণ আরব, পারস্য, আফগানিস্তান অথবা তাতারের অধিবাসীই হোউন আর এতদ্দেশবাসী হিন্দুই হউন, আমরা এক্ষণে বাঙ্গালী, আমাদের মাতৃভাষা বাঙ্গালা। তাহারা (বাংলা ভাষার শত্রুরা) বাঙ্গালার বাঁশ বন ও আম্রকাননের মধ্যস্থিত পর্নকূটিরে নিদ্রা যাইয়াও এখনো বোগদাদ, বোখারা, কাবুল, কান্দাহারের স্বপ্ন দেখিয়া থাকেন। কেহ কেহ আবার বাঙ্গালার পরিবর্তে উর্দুকে মাতৃভাষা করিবার মোহে বিভোর। দুর্বল ব্যক্তিরা যেমন অলৌকিক স্বপ্নদর্শন করে, অধঃপতিত জাতিও তেমনি অস্বাভাবিক খেয়াল আটিয়া থাকে।
(হামেদ আলী, বাসনা, ২: ১, ১৩১৬)
গ. বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা। ইহা দিনের আলোর মতো সত্য। ভারতব্যপী জাতীয়তা সৃষ্টির অনুরোধে বঙ্গদেশে উর্দু চালাইবার প্রয়োজন যতোই অভিপ্রেত হউক না কেন , সে চেষ্টা আকাশে ঘর বাঁধিবার ন্যায় নিস্ফল। (মো. ইয়াকুব আলী চৌধুরী, কোহিনুর, মাঘ, ১৩২২)
ঘ. উর্দু–ভাষীরা যে বাংলাদেশের মুসলমানদিগের মধ্যে বাংলার পরিবর্তে উর্দু ভাষা চালাইবার চেষ্টা করেন, এইটা তাহাদের বড় অন্যায়;—অনধিকারচর্চাও বটে। এইরূপ অন্যায়ের চেষ্টা যাহারা করিয়া থাকেন, তাহাদের সঙ্গে আবার একদল ‘ফেউ আছেন, এই “ফেউ’রা প্রায়ই খাঁটি বাঙালি। ইহারা কলিকাতায় পশ্চিমা নারীর পাণি গ্রহণ করিয়া স্ত্রীর খাতিরে মাকে ছাড়িয়া শাশুড়িকে মা বলিয়া ডাকেন। আর একদল আছেন, যাহারা বক্রাক্ষর দেখিলেই আত্মহারা হইয়া যায়। (মোজাফফর আহমেদ, আল এসলাম, ৩:৪, ১৯২৪)
ঙ. কেহ কেহ উর্দুর স্বপ্নে বিভোর হইলেও বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা যে বাঙ্গালা, এ বিষয়ে কোনো মতদ্বৈধ থাকা উচিৎ নহে।…আমার স্বজাতির ভাইয়েরা কেবল এই কথাই মনে রাখিবেন যে বর্তমান বাঙ্গালা ভাষা সংস্কৃত মূলকই হউক আর যাহাই হউক, উহা আমাদেরই মাতৃভাষা। (সৈয়দ এমদাদ আলী, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, ১;২, ১৩২৫)
উপরের উদ্ধুতিগুলো ষ্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, তাঁরা কয়েকটি মিথ্যাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ত্যাগ করেছিলেন। উর্দু, আরবি, ফারসি, ইরান, তুরান, মরুভূমি ত্যাগ করে বাংলা ও বাংলাদেশে দীর্ঘ শেকড় প্রোথিত করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু তাঁরা যে কলহে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা নির্দেশ করে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। বাহান্নতে ঘটে তার বিস্ফোরণ। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সম্ভবত পৃথিবীর দীর্ঘতম সংগ্রাম।
থেমে থাকেনি ভাষা-বিতর্ক
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি কবি ইকবালের কবিতা নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে কলকাতার মেয়র আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ছিলেন সভাপতি, আর আলোচক ছিলেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। সভায় ইংরেজি আর উর্দুতে আলোচনা হলেও সভাপতি বাংলায় আলোচনার অনুমতি দেননি। তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন হবীবুল্লাহ বাহার ও শওকত ওসমান। এতে সভাপতি নিজেই সভা কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান। পরদিন অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে এই ঘটনার উল্লেখ করেন। মাতৃভাষার প্রতি বাঙালি মুসলমান তরুণদের ভালোবাসার প্রকাশ দেখে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন।
ইতিহাস জানাচ্ছে, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ১৯৪৬ সালের ঘোষণাপত্রে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিশ্রুতি ছিল।
১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দ্রাবাদে উর্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু। ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন ঘোষণা করেন, ভারত বিভক্ত হবে, বঙ্গবিভাগ হবে এবং ভারতে দুই অংশে বিভক্ত হয়ে একটি রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণার পর কলকাতার মুসলমান লেখক-সাংবাদিকদের কয়েকজন আজাদ পত্রিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। এদের মধ্যে ছিলেন প্রাবন্ধিক আব্দুল হক, কবি আবুল হোসেন, কবি আহসান হাবীব। ভাষাবিষয়ক এই বিতর্কে আরও যারা যোগ দেন, তারা হলেন কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ এনামুল হক. ফররুখ আহমদ, আবুল কাশেম প্রমুখ।
দেশভাগ হলো। ভাষা প্রসঙ্গটি বিতর্কে রূপ নিতে খুব বেশি দেরী হলো না।
আমরা ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ড. মুহম্মদ এনামুল হকের একটি প্রবন্ধ থেকে কিছু অংশ পড়ে দেখতে পারি। তিনি লিখছেন, ‘এক রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্রভাষা অচল—আমাদের এই চিন্তা কি মঙ্গলময় সুফলপ্রসূ? ইংরেজদের ন্যায় সাম্রাজ্যবাদীরা এই রাষ্ট্রকে এইরূপ সামগ্রিকভাবে চিন্তা করিয়া থাকেন।…
যাহারা পাকিস্তানকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করিতে অভ্যস্ত, তাহারা মুক্তবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নহেন বলিয়া মনে হয়। তাহারা প্রথমত ভুলিয়া যান যে, পাকিস্তান পৃথক পৃথক ভৌগোলিক পরিবেশে অবস্থিত বিভিন্ন ভাষাভাষী রাজ্য সমন্বিত একটি রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের পূর্বাংশে সর্বত্রই বাংলা এবং পশ্চিমাংশের নানা স্থানে নানা ভাষা প্রচলিত। ইহার প্রায় ৪ কোটি লোক বাংলা ভাষা বলে এবং অবশিষ্ট তিন কোটি লোক অন্যান্য ভাষা বলিয়া থাকে। সিন্ধি লন্ধী, পাঞ্জাবি, গুরুমুখী, বেলুচি ও পশতু প্রভৃতি পশ্চিম পাকিস্তানি ভাষা জনসাধারণের মৌখিক ভাষা,—লেখা হইলেও, সাহিত্য সম্পদে সম্পদশালী নহে। সেই জন্যই রাষ্ট্রীয় ভাষার স্থান দখল করিতে অসমর্থ। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে ভব্য ও ভদ্রসমাজে দেশি ভাষা চলে না—তৎস্থলে চলে উর্দু। বলাবাহুল্য, পাঞ্জাব ও সিন্ধুর অধিকাংশ শিক্ষিত লোকের সাহিত্যের ভাষাও উর্দু। অতএব, বলিতে পারা যায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের লোকের পক্ষে উর্দুকে তাহাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষা, বিশেষত রাষ্ট্রীয় ভাষা বলিয়া গ্রহণ না করিয়া উপায়ন্তর নাই। যাহারা উপায়ন্তরবিহীন তাহাদের কথা স্বতন্ত্র। আমাদের ন্যায় যাহাদের অন্য উপায় রহিয়াছে, তাহারা অনন্য গতিদের শরণ লইবেন কেন? এইরূপ করা কি নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ নহে?’
ড. মুহম্মদ এনামুল হক এরপর পৃথিবীর নানা দেশের লোকসংখ্যার অনুপাতে বাংলা ভাষার অবস্থান, বাংলার সাহিত্য সম্পদ, এই ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য, ভাবসম্পদ সম্পর্কে জানান। তারপর রাশিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্রভাষা থাকাটা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘(উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে) … ইহাতে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সর্বনাশ ঘটিবে। নিশ্চিত রূপে এই তথাকথিত সান্ত্বনার পথ উর্দুর সড়ক ধরিয়া আসিলে পূর্ব-পাকিস্তানবাসীর মরণ—রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মৃত্যু।’
পাকিস্তানের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আব্দুর রব নিশতার সিলেট সফরে যান ১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারি। সিলেট মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুস সামাদের নেতৃত্বে একদল ছাত্র মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তারা দাবি জানিয়েছিলেন, পূর্ববঙ্গের অফিস-আদালতে সরকারি ভাষা এবং শিক্ষার বাহনরূপে বাংলাকে যেন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা ঢাকায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সঙ্গে বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ২ ফেব্রুয়ারি ভিক্টোরিয়া পার্কে জনসভার শেষে শিক্ষামন্ত্রী মন্তব্য করেন, রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি গণপরিষদের বিবেচনার বিষয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকেও গণপরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সদস্যদের সম্মিলিত বিরোধিতায় তা বাতিল হয়ে যায়।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই বীরোচিত সংগ্রামটি তুলে ধরা না হলে ভাষা আন্দোলনের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংগ্রাম
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৬ মাসের মধ্যেই ভাষা প্রসঙ্গটি গণপরিষদের আলোচনায় আসে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকেও গণপরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। সংশোধনী প্রস্তাবটি গণপরিষদের আলোচনায় উঠেছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি। মুসলিম লীগ সদস্যদের সম্মিলিত বিরোধিতায় তা বাতিল হয়ে যায়।
দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ২৬ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে একটি সংবাদ ছাপা হয়। শিরোনাম ছিল:
‘পাক গণপরিষদে বাঙ্গলাকে পরিষদের ভাষা করার দাবি, পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রীর তীব্র বিরোধিতা, ইংরেজি উর্দু ভাষায় কাজ চালাইবার প্রস্তাব গৃহীত’।
গুরুত্বপূর্ণ বলে সংবাদের কিছু অংশ তুলে ধরছি:
করাচি ২৫ ফেব্রুয়ারি। অদ্য পাকিস্তান গণপরিষদে প্রবল বিতর্কের পর ইংরেজি উর্দু ভাষার সহিত বাঙ্গলা ভাষাকে পরিষদের সরকারি ভাষা করিবার প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়। শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত খসড়া নিয়ন্ত্রণ প্রণালীর ২৯ নং ধারা সম্পর্কে এক সংশোধন প্রস্তাব আনয়ন করিলে এই বিতর্কের উৎপত্তি হয়। ২৯ ধারা অনুযায়ী পরিষদে প্রত্যেক সদস্যকে উর্দু বা ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করিতে হইবে। শ্রীযুক্ত দত্ত প্রস্তাব উত্থাপন করিয়া বলেন যে, প্রাদেশিকতার মনোভাব লইয়া তিনি এই প্রস্তাব করেন নাই। পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে বাঙ্গলা ভাষাভাষীর সংখ্যা হইতেছে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ। এই কারণেই তিনি এই প্রস্তাব আনয়ন করিয়াছেন। তিনি আরো বলেন যে, সংখ্যাধিক্যের কথিত ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হওয়া উচিত। সুতরাং বাঙ্গলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত।
সংশোধন প্রস্তাবের বিরোধিতা করিয়া পরিষদের নেতা জনাব লিয়াকত আলী খান বলেন, ‘পাকিস্তান একটি মোছলেম রাষ্ট্র সুতরাং পাকিস্তানের ভাষা মোছলেম রাষ্ট্রের ভাষাই হওয়া উচিত। প্রথমে সংশোধন প্রস্তাবের উদ্দেশ্য নির্দোষ বলিয়া আমি ভাবিয়াছিলাম। প্রস্তাবে বাংলাকে পরিষদের ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হইয়াছিল। কিন্তু বর্তমানে মনে হয়, পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ঐক্যসূত্রে স্থাপনের প্রচেষ্টা হইতে মুছলমানদের বিচ্ছিন্ন করা এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।’
পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খওয়াজা নাজেমুদ্দীন বলেন, উর্দুই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইতে পারে বলিয়া পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ লোকের অভিমত। বাংলাকে সরকারি ভাষা করিবার কোনই যুক্তি নাই। তবে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ও শাসনকার্যের ক্ষেত্রে যথা সময়ে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হইবে।’’
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে কোনো অবিবেচক প্রস্তাব রাখেননি, সেটা এ বিষয়ে তাঁর ভাষণেই ষ্পষ্ট। পাকিস্তান গণ পরিষদের বক্তৃতাদান ও কার্যবিবরণীর ক্ষেত্রে লেখা ছিল, ‘কেবলমাত্র উর্দু অথবা ইংরেজীতেই পরিচালিত হবে।’
এখানে বলা প্রয়োজন, সে সময় বাংলাহীন গণ পরিষদে দাঁড়িয়ে যিনি বাংলাকেও এই তালিকার অন্তর্ভূক্ত করতে বলেছিলেন, তিনি মুসলমান ছিলেন না। বাংলার মানুষের ভোটেই পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল, কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত গণ পরিষদের কোনো মুসলমান সদস্য বাংলা ভাষার দাবি তোলেননি। তুলেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। এ থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তান আন্দোলন সে সময় বাঙালি মুসলমানদের এতোটাই মোহগ্রস্ত করে তুলেছিল যে, প্রাথমিকভাবে ভাষা প্রশ্নটির তাৎপর্য বোঝার মতো অবস্থায় তাঁরা ছিলেন না।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা হলে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্ররা ধর্মঘট করে। ২৯ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে ছাত্র ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়টি বলা হয়, রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বাদানুবাদের জন্ম পাকিস্তান সৃষ্টির বহু আগে থেকেই। দেশের ৬১ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষাকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়, বরং তা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যোগ্য। আজাদ পত্রিকা তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটিকে যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করেছিল। বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানকে মুসলিম রাষ্ট্র বললেও কায়েদে আজম বহুবার দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করেছেন। এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের মনে নিষ্ঠুর আঘাত দেওয়া হয়েছে। ন্যায্য দাবির প্রতি উপেক্ষায় পূর্ব বাংলা আজ বিক্ষুব্ধ।
তখন পূর্ব বাংলার মানুষ সত্যিই বিক্ষুব্ধ ছিল, এবং সেই বিক্ষুব্ধ মানুষের প্রতি পাকিস্তান সরকারের পেটোয়া বাহিনী ছিল সক্রিয়, তারই প্রকাশ দেখা যায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চে। সেদিন প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট ছিল।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা এখানে আরেকটু বলে নেওয়া দরকার। ১৫ মার্চ খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ৮ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক-পরিষদে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ এবং যথাসম্ভব শীঘ্র বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন খাজা নাজিমুদ্দীন। এখানেও সংশোধনী আনেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি গণপরিষদ সদস্যদের, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার সদস্যদের অনুরোধ করেন, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু সে প্রস্তাব সে সময় পাশ হয়নি। পাশ হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে। সে কথাও হবে।
প্রথম সফল প্রতিবাদ
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের প্রতিবাদকেই ভাষা আন্দোলনে প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ বলা যায়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি গণপরিষদে অগ্রাহ্য করার পর থেকেই বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।
২৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ. জগন্নাথ কলেজ এবং কয়েকটি স্কুলেও তাৎক্ষণিকভাবে ধর্মঘট হয়। মিছিল হয় এবং সে মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্রসভা পরিণত হয় ও সেখান থেকে গণপরিষদের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করা হয়।
তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ বৈঠকে ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ১ মার্চ তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের একটি বিবৃতি প্রচারিত হয়। এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন তমদ্দুন মজলিসের আবুল কাশেম, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নাইমউদ্দিন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান ও আবদুর রহমান চৌধুরী।
জেলায় জেলায় পোস্টারিং করা হয়। সাংগঠনিক সফর শুরু করা হয়।
২ মার্চ ফজলুল হক হলে বিভিন্ন চিন্তার সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এক সভা করেন।
ধর্মঘট সফল করার জন্য জেলা ও থানা শহরগুলোয় সাংগঠনিক সফর করেন শিক্ষার্থীরা। ১১ মার্চে তার প্রতিফলন দেখা যায় ঢাকার বাইরে বেশ কিছু শহরে, উল্লেখযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে ছিল ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশাল।
১১ মার্চের কর্মসূচি নিয়ে সংগ্রাম পরিষদ ৪ এবং ৫ মার্চ আলোচনা করে। ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কর্মসূচি ও কর্ম তৎপরতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হয়।
আন্দোলন সফল করে তোলার জন্য সেই রাতের বৈঠকেই ঠিক করে নেয়া হয়েছিল, সচিবালয়ের আশপাশে কে কোথায় কিভাবে অবস্থান নেবেন। প্রথম গেটের সামনে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ এবং দ্বিতীয় গেটের সামনে কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী প্রমূখ নেতা অবরোধ কর্মসূচির দায়িত্বে ছিলেন।
ছাত্রদের বিক্ষোভ ছিল নিরস্ত্র। কিন্তু পুলিশ তাতে লাঠিচার্জ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নইমুদ্দিনের সভাপতিত্বে ছাত্ররা প্রতিবাদ সভা করে। সভাশেষে ছাত্র মিছিল আবার কার্জন হল, হাইকোর্ট এবং সেক্রেটারিয়েটের সামনে রাস্তায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ জানাতে থাকলে পুলিশ আবার লাঠিচার্জ করতে থাকে। পুলিশ সেদিন কমিউনিস্ট পার্টির অফিস, বইয়ের দোকান তছনছ করে। যুবনেতা তোয়াহা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিন। ১৯৪৮ সালের এই দিনটিতে এসেই পূর্ব বাংলার মানুষ উপলব্ধি করেছিল, ভাষা প্রসঙ্গটি বেঁচে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এইদিন ৯০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়েছিলেন দুইশ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জেলে নেওয়া হয় উনসত্তরজনকে। যাদের মধ্যে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী প্রমুখ ছিলেন।
১৩ মার্চ সকল শিক্ষায়তনের ধর্মঘট পালিত হয়।
১৪ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। ১৫ মার্চ সারা দেশে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেদিনই।
পরদিন পরিষদ ভবনের সামনে অব্যাহত বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন ছাত্রদের সাথে আপোষ মীমাংসার প্রস্তাব পাঠান। সংগ্রাম পরিষদ তাতে সাড়া দেয় এবং ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত তাদের সভায় কামরুদ্দিন আহমেদের তৈরি করা আলোচ্যসূচি কিছু পরিবর্তনসহ গৃহীত হয়। সে সময়ে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ ছিলেন জেলখানায়। তাদের সম্মতি সাপেক্ষে তুমুল বিতর্কের পর ৮ দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হয়।
স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাগুলোয় ছিল প্রধানত ভাষা আন্দোলনের কারণে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মুক্তিদান, পুলিশি হামলার তদন্ত, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ববঙ্গ আইনসভার অধিবেশনে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা সম্পর্কে প্রস্তাব উত্থাপন, প্রদেশে সর্বস্তরে বাংলার পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া, সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার (যে কাগজগুলো কলকাতা থেকে আসত, সেগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এরমধ্যে ছিল ইত্তেহাদ), কোনো কোনো জায়গায় জারিকৃত ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীরা দেশের দুশমন নন, এই স্বীকৃতি।
অনেকেই এখন মনে করেন, ছাত্রদের সঙ্গে খাজা নাজিমউদ্দিন এই চুক্তি করেছিলেন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে। কিছুদিন পরই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফর করবেন। সে সময় যেন ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে জিন্নাহর এই সফরকে ঘিরে কোনো গোলযোগের সৃষ্টি না করে, সেটাই হয়তো ছিল চালাকি।
ঢাকায় জিন্নাহ
ছাত্রদের সঙ্গে চুক্তিটা ছিল খাজা নাজিমুদ্দীনের চালাকি। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ। চুক্তির কারণে ভাষা আন্দোলন স্থগিত ছিল।
১৯ মার্চ বিকেলে তেজগাঁও বিমানবন্দরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এসে পৌঁছলে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা জানান। ২১ মার্চ তিনি বক্তৃতা দেন রেসকোর্স ময়দানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন চব্বিশে মার্চ এবং ঢাকা ত্যাগের আগে তিনি বেতার কেন্দ্রে গিয়ে আর একটি ভাষণ দেন।
যে জিন্নাহ পাকিস্তান আন্দোলনকে সার্থক করে তুলেছিলেন বাঙালি মুসলমানদের সক্রিয় সহযোগিতায়, তিনিই খুবই রূঢ়ভাবে শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সমর্থন করে বক্তব্য দেন। তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে জাতির খেদমত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জিন্নাহর সেদিনের কথায় মনে হয়েছিল, তিনি মূলত মুসলিম লীগের সমালোচকমাত্রকেই সন্দেহ করছিলেন এবং মনে করছিলেন এরা রাষ্ট্রবিরোধী।
রমনা রেসকোর্সের ময়দানে (এখন যার নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নাগরিক সংবর্ধনায় প্রায় এক ঘন্টার মতো দীর্ঘ ভাষণে তিনি সদ্যোজাত রাষ্ট্র পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে আলোচনা করেন। সামগ্রিকভাবে তাঁর মনোভঙ্গি ছিল একদেশদর্শী, উর্দুভাষীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বপূর্ণ, সাম্প্রদায়িক ও সূক্ষ্মভাবে বাঙালি বিদ্বেষী।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বলিতে চাই যে, উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে, অন্য কোন ভাষা নহে। যে কেহ অন্য পথে চালিত হইবে সেই পাকিস্তানের শত্রু।’
২৪ মার্চ কার্জন হলে সমাবর্তন বক্তৃতায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে একই কথার পুনরাবৃত্তি করলে উপস্থিত ছাত্রদের মধ্য থেকে ইংরেজিতে ‘নো নো’ ধ্বনিতে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিছুটা শান্তভাবে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। বেতার ভাষণে তিনি আবার রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি উচ্চারণ করেন।
সেদিন সন্ধ্যায় সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একটি বৈঠকে বসেন এবং তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। প্রতিনিধি দল তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন। প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাশেম, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমূখ।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন হল ডাকসুর প্রতিনিধিদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান ছাত্র থাকায় তিনি আর মুখ খোলেননি। অথচ স্বাধীনতার আগে ১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট সম্ভাব্য রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়নের সময় তিনি এই রাষ্ট্রটির যে চেহারা তুলে ধরেছিলেন, সেটি ছিল গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক। তিনি বলেছিলেন, ‘এখন থেকে কেউ আর মুসলমান বা হিন্দু নয়, সবাই পাকিস্তানি।’ কিন্তু নবগঠিত রাষ্ট্রকে তিনি পৃথিবীর অন্যতম সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করলেন।
ছাত্র ও যুবকদের মধ্যে যারা লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক পাকিস্তান আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল, তারা পাকিস্তানকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলেই বিবেচনা করত। ফলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কন্ঠে এরকম প্রতিক্রিয়াশীল কথা তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। সত্যের খাতিরে স্বীকার করে নেওয়া ভালো, বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এবং ছাত্রদের মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল, যারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থক হিসেবে জিন্নাহর বক্তৃতাকে স্বাগত জানিয়েছিল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম ছাত্রসভা উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে জিন্নাহকে সমর্থন করেন। এই ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হুদা, মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমূখ।
জিন্না তখন পর্যন্ত ছিলেন বাঙালিদের চোখে পাকিস্তানের সমার্থক শব্দ। কিন্তু ঢাকার দুটি ভাষণ বাঙালি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিন্নাহর সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি করল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাঙালি ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে তিনি তাঁর পূর্ব মর্যাদা হারালেন অকারণে বাংলা ভাষায় বিরোধিতা করার জন্য। কিন্তু আগেই বলেছি, জিন্না একটা ষড়যন্ত্র বা সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে গেলেন, যা দিয়ে পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ প্রভাবিত হলো। খাজা নাজিমুদ্দিন তার নিজের হাতে করা চুক্তিকেই ধুলিস্যাৎ করে দিলেন। এই পর্যায়ে এসে আমরা দেখতে পাব, বাংলার প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ যেমন মাওলানা আকরাম খাঁ ভাষা–প্রশ্নে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেলেন। অথচ কিছুদিন আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি সমর্থন করে আসছিলেন। তমদ্দুন মজলিস এ সময় জিন্নাহর ভাবধারায় প্রভাবিত হয়েছিল এবং তারা ধীরে ধীরে এই আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল।
১১ মার্চের তীব্র বিক্ষোভ এ সময় শুধু একটি আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে বহাল রইল। কিন্তু আন্দোলনের সেই বেগ সেই মুহূর্তে অন্তত থাকল না।
তাৎপর্যময় ২০ ফেব্রুয়ারি
১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস উদযাপন কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খালেক নেওয়াজ খানের সভাপতিত্বে এক ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে বক্তারা আলোচনা করেন এবং এই কমিটি পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটি গঠিত হওয়ার কয়েকদিন পর তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পতাকা দিবস উদযাপন করা হয় এবং গণ পরিষদের সদস্যদের কাছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে এ সংক্রান্ত একটি খসড়া কমিটি গঠন করা হয়। হাবিবুর রহমান শেলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে এই খসড়াটি গৃহীত হয় ২৫ মার্চ। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্মারকলিপিটি মুদ্রণের পর তা পাকিস্তান গণপরিষদে সদস্যদের কাছে এবং পাকিস্তানের সবগুলো পত্রিকাতে পাঠানো হয়।
লিয়াকত আলি খান রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন খাজা নাজিমুদ্দিন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় আসেন এবং ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বক্তৃতা দেন। সেখানে নাজিমুদ্দিন বলেছিলেন যে, ‘পূর্ববাংলার ভাষা কী হবে, সেটা পূর্ববাংলার জনগণই নির্ধারণ করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।’
২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রতিবাদ হয়।
৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ প্রতীক ধর্মঘট ও সভা আহ্বান করে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেয়ে যায় পোস্টারে পোস্টারে। ১৯৪৮ সালে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, তার বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা। সভায় ৪ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। একটি মিছিল ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে।
৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কাজী গোলাম মাহবুব একটি সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন যোগদান করে। এই সভায় খাজা নাজিমুদ্দিনের পল্টন ময়দানের বক্তৃতার রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ করা হয় এবং বক্তব্য প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়। বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রচলনের সরকারি চক্রান্তের বিরোধিতা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়।
৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ধর্মঘটের পর ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সমবেত হয় এবং সেখানে গাজীউল হকের সভাপতিত্বে একটি ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পূর্ববাংলা পরিষদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেদিনটিকে লক্ষ্য করে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা পূর্ববাংলায় এক সাধারন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সভা শেষ হলে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাসভবন, হাইকোর্টের সামনে দিয়ে নবাবপুর, পাটুয়াটুলী, আরমানিটোলা, নাজিমুদ্দিন রোড অতিক্রম করে আবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরে যশোর, নোয়াখালী ও রাজশাহীতেও শোভাযাত্রা হয়।
২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারা জারি করে। তখন আন্দোলনকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটিই এসে দাঁড়াল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না। সেদিনই বিকেল ৩টায় শুরু হয়েছিল পরিষদ সভা। ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ ও ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদে’র কর্মসূচিতে পরিষদ ভবন ঘেরাওয়ের কথা ছিল। কিন্তু তাতে এমন কোনো ঘোষণা ছিল না, যাতে জনসাধারণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে
আওয়ামী মুসলিম লীগের ৯৪ নবাবপুর রোডের অফিসে খেলাফাতে রব্বানী পার্টির আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে বিকেল পাঁচটায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়।
ভোটাভুটিতে দেখা গেল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে ভোট পড়েছে ১১ জনের, ভঙ্গ করার পক্ষে ভোট পড়েছে চারজনের।
যুক্তি-তর্কের পর ঠিক হলো, ১৪৪ ধারা ভাঙা ও না ভাঙার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হবে পরদিনের ছাত্রসভায়। ছাত্ররাই সিদ্ধান্ত নেবে।
এরপর এল ২১শে ফেব্রুয়ারি। সে কথাই বলা হবে। তবে বলে রাখা ভালো, শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছিল। ফলে, গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আমতলার সভাটি আসলে বারুদে আগুন দিয়েছে শুধু।
বিনিদ্র রাত ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ
২০ ফেব্রুয়ারি রাতটি ছিল অনেকের জন্য বিনিদ্র রাত। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি না হবে, তা নিয়ে ছাত্রসমাজে ছিল উত্তেজনা। তবে এ কথা বলা যায়, আন্দোলনের তোড়ে ভাষার দাবি হয়ে উঠেছিল জোরালো। খাজা নাজিমুদ্দীনের উর্দুর পক্ষে সাফাই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না ছাত্ররা। ফলে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১১-৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে দাঁড়ালেও ছাত্ররা সেটা মেনে নেয়নি।
রাষ্ট্রভাষা-বিষয়ক আন্দোলন হিন্দু-মুসলিমের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে দিল। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের মনকে সক্রিয় করল। সুক্ষ্ণভাবে বিকশিত হলো জাতীয়তাবাদী ধারা। বহুদিন পর জাতি হিসেবে বাঙালির মধ্যে দেখা গেল ঐক্য। এতটা ঐক্যবদ্ধ আর কবে হয়েছে বাঙালি? এরপর এই পথ ধরেই তো তারা পৌঁছে গেছে একাত্তরে।
রাতটা ছিল ঘটনাবহুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো হলেই উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের দেখা যাচ্ছিল। এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে যারা লেখালেখি করেছেন, তাদের অনেকে এই ঘটনাটিকে গুরুত্বহীন বলার জন্য কলম ধরেছেন, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতার কথা মনে রাখলে বলতে হবে, ফজলুল হক পুকুরপাড়ের রাতের বৈঠকটি ছিল তাৎপর্যময়।
সেই বৈঠকে যে ১১ জন ছাত্র অংশ নেয়, তাদের মধ্যে একজন ২১ ফেব্রুয়ারির সভায় সভাপতিত্ব করেন, একজন তাঁর নাম প্রস্তাব করেন, একজন সে নাম সমর্থন করেন, একজন দশজনি প্রথম মিছিলের অগ্রভাগে থাকেন, একজন দায়িত্ব নেন দশজনি মিছিল নিয়ে যারা বের হচ্ছেন তাদের নাম লেখার। এরা হলেন যথাক্রমে গাজীউল হক, এম আর আখতার মুকুল, কামরুদ্দীন শহুদ, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ সুলতান।
তবে এ কথাও ঠিক, সেদিন আওয়ামী লীগ অফিসে সভার পর সম্মিলিতভাবে ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার মতো মানসিক অবস্থানে পৌঁছেছিল। সলিমুল্লাহ হল ইউনিয়নের ভিপি মুজিবুল হক ও জিএস হেদায়েত হোসেন চৌধুরী ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু সে হলেরই এস এ বারি এ,টি এবং ফকির শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিটিং হয়। ফজলুল হক হল, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরাও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা যে একই পথে হেঁটেছিল, সে কথাও তারা জানিয়ে দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের।
অনেকেই এখন ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাগুলোর কোনটা কখন ঘটেছে, তা গুলিয়ে ফেলেন। মনে রাখতে হবে, সকালে আমতলার সভা ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১০ জনি মিছিলের বিষয়টি প্রায় স্তিমিত হয়ে এসেছিল দুপুরের দিকে। পরের ঘটনা ঘটেছিল মেডিকেলের সামনের রাস্তায়। এ পথ দিয়েই পরিষদে যেতেন সদস্যরা। সে ঘটনা বলা হবে আমতলার সভা নিয়ে কথা বলার পর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অন্য কলেজ ও স্কুল থেকেও শিক্ষার্থীরা এসেছিল সভায়।
আমতলার সভা শুরু হয়েছিল বেলা এগারটার দিকে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে তাঁর যুক্তি উপস্থাপন করেন। কিন্তু উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা তাঁর কথার প্রতিবাদ করতে থাকে। প্রতিবাদের তোড়ে শামসুল হকের কথা আর শোনা যায় না। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সভার সভাপতি গাজীউল হকও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে তাঁর মতামত দেন। দশজনি মিছিল নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
সভা শেষ হলে কিছুক্ষণ বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করে। এ সময় হাবিবুর রহমান শেলী কয়েকজনকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে আরো কয়েকজন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায়। এরপর একটির পর একটি মিছিল বের হতে থাকে। কে কার আগে বের হবে, তা নিয়ে অস্থির হয়ে ওঠে সবাই। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এগিয়ে যেতে থাকে শিক্ষার্থীরা। পুলিশের সঙ্গে ধাক্বাধাক্কি হয়। একটু পরেই পুলিশের ট্রাকের ওপর ছাত্রদের দেখা পাওয়া যায়। এ সময় ছাত্রীরাও এগিয়ে আসে মিছিল নিয়ে। সে মিছিলে শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া ইব্রাহিম, নার্গিস বেগমদের দেখা যায়। ছাত্রীদের মিছিল থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, কিন্তু কাঁদুনে গ্যাসের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি।
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। চলতে থাকে পুলিশের লাঠিচার্জ। বেলতলার ডোবায় রুমাল ভিজিয়ে চোখে চেপে ধরতে থাকে শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা তখন পুলিশের বাধা ডিঙিয়ে মেডিকেল হোস্টেলে পৌঁছুনোর চেষ্টা করছিল। তার কিছু দূরেই ছিল পরিষদ ভবন। পরিষদ সদস্যদেরকেই তো বলতে হবে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’
অকস্মাত গুলির শব্দ
২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের আন্দোলনের ওপর পুলিশ গুলি চালাতে পারে, এ রকম কথা কেউই ভাবতে পারেনি। লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস, গ্রেপ্তার ইত্যাদি পর্যন্ত ছিল ভাবনার সীমানা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মানুষের শরীর লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ভাবনা কার মাথায় এসেছিল, সে রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। তবে অবাঙ্গালী হেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোরাইশী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ মাহমুদ এবং চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদের ওপর দায় চাপানো হয়। বাঙালি ডিআইজি ওবায়দুল্লাহর কথা চেপে যাওয়া হয়। আর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা তো ছিলেন বাঙালি। সুতরাং তাদের ওপরও গুলিবর্ষণের দায় বর্তায়।
তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন ছিল মেডিকেল কলেজের লাগোয়া। দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেয়ালের একটি অংশ ছিল ফাঁকা। সেই ফাঁক দিয়ে দলে দলে ছাত্ররা যাচ্ছিল মেডিকেল হোস্টেলের দিকে। এখন যেখানে মেডিকেল কলেজের আউটডোর আর ডিসপেন্সারি, সেখানেই ছিল মেডিকেল হোস্টেলের ব্যারাকগুলো।
পূর্ববঙ্গ বিধানসভার অধিবেশন ছিল বেলা তিনটায়। মেডিকেল হোস্টেলের সামনে দিয়ে পরিষদ সদস্যদের কেউ কেউ যাবেন, সেটা ভেবেছিল ছাত্ররা। মানিকগঞ্জের এমএলএ আওলাদ হোসেনের সঙ্গে রাজা মিয়াকেও কিছু তরুণ ছাত্র মেডিকেল হোস্টেলে নিয়ে এসেছিল। পরিষদে রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলাকে গ্রহণ, না করলে ইস্তফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয় আওলাদ হোসেনের কাছ থেকে।
পুলিশের লাঠিচার্জ আর টিয়ারগ্যাসের বিপরীতে ছাত্ররা ছুড়ে মারছিল ইট-পাটকেল। সে সময় শ্লোগান উঠল, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো জনসমাগম হতে থাকল। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় মাঠ, মেডিকেল কলেজ গেটের সামনে এবং আশপাশের এলাকা ভরে গিয়েছিল আন্দোলনরত মানুষে। সেদিন নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, যশোর, দিনাজপুরে পরিপূর্ণ হরতাল হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাসে সেই আন্দোলনকারীদের নামও অক্ষয় হয়ে থাকবে।
পুলিশ গুলি চালিয়েছিল তিনটার পর। উপস্থিত ছাত্র-জনতা ভেবেছিল এটা বুঝি টিয়ারশেল নিক্ষেপের শব্দ। কিন্তু এটা যে টিয়ার শেল নয়, গুলি, সেটা বোঝা গেল কয়েকজনকে পড়ে যেতে দেখে। তাদের শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছিল।
পুলিশ প্রথমে গুলি ছুড়েছিল মেডিকেল ব্যারাকে না ঢুকে, পরে ভিতরে ঢুকেও গুলি করেছে। সেদিন যারা মারা গিয়েছিলেন, তারা হলেন রফিকুদ্দিন, আবুল বরকত ও আবদুল জব্বার। সেদিন গুলিতে আহত হয়েছিলেন আবদৃস সালাম, তবে তিনি হাসপাতালে মারা যান ৭ এপ্রিল। ভাষা শহীদদের নিয়ে লেখা হবে কাল।
সে সময় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত আমগাছের ডালে ডালে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০ নম্বর ব্যারাকের ১ নম্বর কক্ষে ছিল এই কন্ট্রোলরুম। বেলা বারোটার মধ্যে কন্ট্রোল রুম তৈরির সব ব্যবস্থা করে ফেলেন মেডিকেল ছাত্র ইয়াহিয়া। স্পিকারটি লাগানো হয়েছিল পরিষদ ভবনের নাকের ডগায়। প্রচারের লাগাতার কন্ঠ দিয়ে যাচ্ছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র সরফুল আলম। ( পরে ভয়েস অফ আমেরিকা, ওয়াশিংটনে ঘোষক-পাঠক), আবুল হাশিম (দীর্ঘকাল যাবত সৌদি আরববাসী চিকিৎসক), এবং আরো দুই-একজন।
গুলি চলার পর থেকেই কন্ট্রোল রুম থেকে যে প্রচার চলছিল, তাতে দেখা দিল গুণগত পরিবর্তন। প্রচারের পাশাপাশি এবার শুরু হয় সরকারবিরোধী বক্তৃতা। ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরিষদ সদস্য মওলানা তর্কবাগীশ এসে এখানে বক্তৃতা করেন।
যে পরিষদের সদস্যদের কাছে, রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি তুলতে বলছিল শিক্ষার্থীরা, সেই পরিষদে সেদিন যে আলোচনা হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় পরিষদের বিবরণীতে। পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছিল সেদিন সাড়ে তিনটার সময়। এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছিল রেই রক্তক্ষয়ী ঘটনা। আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন ধর সরকারের সমালোচনায় ফেটে পড়েন। মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন তখন পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না। পরিষদ সদস্যদের বিধি মেনে চলার অনুরোধ করেন স্পিকার। কিন্তু তারা বললেন, পরিষদের নেতা আগে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে আসবেন, বিবৃতি দেবে, তারপর পরিষদ চলবে।
নুরুল আমিন পরিষদে এসে ছাত্রদের দোষারোপ করতে থাকেন। তার প্রতিবাদ করেন পরিষদ সদস্যদের একাংশ। কী এমন ঘটনা ঘটেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৪৪ ধারা ধারার সময়সীমা বাড়িয়ে একমাস করা হলো, সে বিষয়ে জানতে চান পরিষদ সদস্যরা।
অনেক বাদানুবাদের পর পরিষদ ২২ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ন সাড়ে তিনটা পর্যন্ত পরিষদ মুলতবী রাখেন স্পিকার।
আরো একটি শোকার্ত দিন
২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ছাত্ররা মারা গেছে, এ সংবাদ রাষ্ট্র হয়ে গেলে পুরো পূর্ব বাংলা যেন পরিণত হলো এক নতুন দেশে। শাসকের দল ভেবেছিল, গুলি করে স্তব্ধ করে দেবে আন্দোলন, কিন্তু ঘটনা ঘটল উল্টো। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন এবং সকল হলে ছাত্ররা কালো পতাকা উত্তোলন করে, সবাই কালো ব্যাজ ধারন করে। পুলিশের পক্ষে সে সময়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার মতো শক্তি ছিল না। পুলিশের সঙ্গে ইপিআর আর সেনাবাহিনী এসে রাজপথ টহল দিতে থাকে।
মেডিকেল হোস্টেলের সামনে শহীদদের গায়েবানা জানাজা হয়। লাশ পুলিশ কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল বলে গায়েবানা জানাজা পড়া হয়। অসংখ্য মানুষ সে জানাজায় অংশ নেয়। তবে কত মানুষ অংশ নিয়েছিল, তা নিয়ে মতভেদ আছে। পাঁচ হাজার থেকে তিন লক্ষ পর্যন্ত মানুষের সমাগম হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তবে পঁচিশ-তিরিশ হাজার মানুষ জানাজায় উপস্থিত ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
গায়েবানা জানাজা শেষে একটি বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, ছাত্র হত্যার খবর পাওয়ার পর ছাত্রদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ রাস্তায় বেরিয়ে আসে।
২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছিল মিছিলের শহর। বিশেষ করে নবাবপুর রোডে ছাত্র–জনতার সংখ্য ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তৎকালীন ভিক্টোরিয়া পার্ক পেরিয়ে মিছিল এগিয়ে যায় রথখোলার দিকে। সেখানে এসে থেমেছিল একটি সৈন্যবাহী ট্রাক। মানসী সিনেমার গলি থেকে পুলিশ ও সৈন্যদের একটি অংশ গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। একটি ট্রাক থেকে গুলি ছোড়া হয়। সিরাজুদ্দিন নামে একটি ছেলের কোমরের ওপর গুলি লাগে। তিনি ছিলেন তাঁতী বাজারের বাসিন্দা।
এদিন উন্মত্ত ছাত্র–জনতা মর্নিং নিউজ–এর ছাপাখানা জুবিলি প্রেসে হামলা চালায়। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় সরকারের পক্ষে একপেশে সংবাদ পরিবেশন করায় ছাত্র–জনতা প্রবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্রেসের ওপর।
২২ ফেব্রুয়ারি কতজন শহীদ হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে ঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিকের ভাষ্যমতে, অন্তত চারজন এদিন শহীদ হয়েছিলেন। রাস্তায় যে পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছিল, তারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় গুলিবর্ষণ করেছিল। গুলি করার পর লাশ গুম করে দেওয়া হয়েছিল বলে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। ২৩ ফেব্রুয়ারির আজাদ পত্রিকায় লেখা হয়, এ দিন অন্ততপক্ষে ৪ জন প্রাণ দিয়েছেন এবং শতাধিক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। এদের মধ্যে ৪৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই দিন সাপ্তাহিক সৈনিক লিখেছিল (বিশেষ শহীদ সংখ্যা) আটজন নিহত হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে। তাদের বর্ণনায়, নবাবপুরে ৪জন, কার্জন হলে ২জন এবং রেলওয়ে কলোনীর সামনে ১জন নিহত হয়েছেন। তবে, কার্জন হলের সামনে নিহত হওয়ার সংবাদটি অতিরঞ্জিত বলে অনেকেই মনে করেন।
এদিন যারা নিহত হন, তাদের মধ্যে ছিলেন শফিউর রহমান, আবদুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ ও সিরাজুদ্দিন।
২২ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা কিংবা সান্ধ্য আইনের ভয়াবহতা উপেক্ষা করে ছাত্ররা মুক্তভাবেই তাদের উপস্থিতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সে সময় ছাত্রদের এলাকায় এসে নিজেদের কঠোরতার পরিচয় দেওয়ার মতো সাহস সরকারি বাহিনীর ছিল না। বলে রাখা ভালো, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অঙ্গীকার যারা করেছিল, তারা তো বটেই, যারা ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই নেতারাও তখন মেডিকেল ব্যারাকে এসেছেন।
২২ ফেব্রুয়ারি আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকার সম্পাদক এবং সিলেট জেলা মুসলিম লীগের সদস্য মাহমুদ আলী মুসলিম লীগ কাউন্সিল থেকে এবং লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
এইদিন পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিষদে সরকার রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
তেইশে ফেব্রুয়ারিও উত্তাল ছিল রাজপথ। কিন্তু এখন আন্দোলন কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে ছাত্র নেতৃত্ব অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সাংগঠনিক ক্ষমতা কমে যাচ্ছে—এই ছিল তখনকার অবস্থা। কিন্তু এ কথাও ঠিক, সেদিন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পথ ধরে আন্দোলন আবার বেগবান হচ্ছে।
ঢাকায় গড়ে ওঠা সেই শহীদ মিনারের গল্পটাই হবে এরপর।
ভাষা শহীদদের কথা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে কতজন শহীদ হয়েছিলেন নির্দিষ্ট করে তা বলা আজ আর সম্ভব নয়। কিন্তু যে কজন ভাষা শহীদকে নিয়ে আলোচনা হয়, শহীদের সংখ্যা যে তার চেয়ে বেশি, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাষাসংগ্রামীর বক্তব্যে এবং কোন কোন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে এখন রফিক, জব্বার, বরকত, সফিউর ও সালাম ছাড়াও অন্তত আরও তিন জন ভাষা শহীদের পরিচয় আমরা পাই। এরা হলেন কিশোর ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ, রিকশাচালক আব্দুল আউয়াল এবং সিরাজুদ্দিন।
আমরা যা জানি, তা হলো, ভাষা আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দিন আহমদ। দ্বিতীয় শহীদ গফরগাঁওয়ের পাঁচুয়া গ্রামের আবদুল জব্বার। জব্বারের তলপেটে গুলি লেগেছিল। রক্তে ভেসে গিয়েছিল তাঁর লুঙ্গি। এরপর শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত। আবদুস সালাম সেদিন গুলিবিদ্ধ হলেও মারা যান ৭ এপ্রিল। তাঁকে একুশের শহীদ হিসেবেই দেখা হয়।
সেদিন আরো দুজন শহীদ হওয়ার মতো সংবাদ রয়েছে। কিন্তু তাঁদের লাশ আর পাওয়া যায়নি।
এদের একজন কিশোর, একজন যুবক। ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদের খবরে লেখা হয়েছিল, ফুলার রোডে এক কিশোরের লাশ পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল। মাদ্রাসাছাত্র লোকমান আহমদ আমিনী সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি রাস্তার কোনায় গুলিতে এক যুবকের মৃত্যুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন। এলিস কমিশনের রিপোর্টে খেলার মাঠের কোনায় গুলিতে নিহত যুবকের যে কথা বলা হয়েছে, সে যুবকই নিশ্চয় লোকমান আহমদ বর্ণিত যুবকটি।
এই কথা মনে রাখলে আমরা বলতে পারি, ২১ ফেব্রুয়ারি অন্তত ছয়জন শহীদ হয়েছিলেন।
২২ ফেব্রুয়ারি আমরা শুধু সফিউর রহমানের শহীদ হওয়ার ঘটনাটাই মনে রেখেছি। পরবর্তীকালে নানা অনুসন্ধানের পর অন্তত আরো তিনজন ভাষা শহীদের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ২২ ফেব্রুয়ারি ছিল অন্যরকম একটি দিন। হরতাল, মিছিলে ছেয়ে গিয়েছিল ঢাকার রাজপথ। স্বতস্ফূর্তভাবেই মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। দোকানপাট, বাজার সবকিছু শোকস্তব্ধ হয়ে বন্ধ থেকেছে। রেলগাড়ি চলেনি, অফিস–আদালতে স্বাভাবিক কাজ বন্ধ ছিল। সেদিন জনতাকে স্তব্ধ করার জন্য রাস্তায় নেমেছিল পুলিশ ও ইপিআর (সেনাবাহিনী)।
সেদিন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে যারা মারা যান, তাদের মধ্যে ছিলেন হাইকোর্টের কর্মচারী সফিউর রহমান, রিকশাচালক আবদুল আউয়াল, কিশোর ওহিউল্লাহ, তাঁতীবাজারের যুবক সিরাজউদ্দিন। আরো কয়েকজন শহীদের কথা শোনা যায়, কিন্তু পুলিশ ও সেনাবাহিনী লাশ নিয়ে যাওয়ায় তাদের নাম জানা যায়নি।
এইদিনের ঘটনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ভাষা আন্দোলনে ঘটনাকে বিকৃত করে প্রকাশ করায় বিক্ষুব্ধ জনতা মর্নিং নিউজ পত্রিকার ছাপাখানা পুড়িয়ে দিয়েছিল। এ দিন শুধু ঢাকা নয়, সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল আন্দোলন। পরিস্থিতির অবনতি হলে বিচলিত সরকার তড়িঘড়ি করে আইন পরিষদে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার নাম সুপারিশ করে। কিন্তু সেটা যে ছিল মুখ্যমন্ত্রীর একটা কূটচাল, সে বিষয়ে এই বইের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে।১
কঠিন কথা সহজ করে বলি। ঢাকা তখন কাঁপছিল উত্তেজনায়। ছাত্ররা তো নিজের ভাষা রক্ষার দাবিতে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। থরথর কম্পমান সেই সময়টিতেই এসেছিল ২০ ফেব্রুয়ারি। সাল ১৯৫২। সেদিন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। ১৪৪ ধারার মানে হচ্ছে একসঙ্গে চারজনের বেশি মানুষ এক জায়গায় জড়ো হতে পারবে না। হলেই গ্রেপ্তার। তাই ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার ঘোষণা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েই ছিল সংশয়।
আরও একটু আগে ফিরে যাই। বলি ১৯৪৮ সালের কথা। সে বছর ১৯ মার্চ তখনকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এলেন ঢাকায়। ২১ মার্চ তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দুটি বক্তৃতা করেন। দুটি বক্তৃতায়ই তিনি পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর কথা ঘোষণা করেন। যুক্তিহীন এই ঘোষণা মেনে নেওয়ার কোনো কারণ ছিল না বাঙালির। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা, অথচ জিন্নাহ সেটা অগ্রাহ্য করেছেন। তখনই মূলত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। আটচল্লিশ সাল থেকে একান্ন সাল পর্যন্ত কখনো সুতীব্র গতিতে, কখনো ঢিমেতালে ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন চলে আসছিল। সেটাই আবার তীব্রতা পেল ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারিতে। সেদিন পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে। এই বক্তৃতা তাপ ছড়াতে লাগল বাঙালির রক্তে। শুরু হলো আন্দোলন। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার জারি করল ১৪৪ ধারা, যা আগেও বলেছি।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার ঘোষণা দেওয়ার পর ছাত্ররা কীভাবে ১০ জনের এক একটা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে শুরু করল, সে ইতিহাস সবার জানা। তাই সে বিষয়ে আর ঢুকলাম না। আমি এখন ভাষা আন্দোলনের সেই সময়টিতে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের পরিচয় তুলে ধরি। তাঁদের কথাই বলি আজ।
আবুল বরকত
জানি, আবুল বরকতের নামটি সবার খুব পরিচিত। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ১৯২৭ সালের ১৬ জুন ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে তাঁর জন্ম। আবুল বরকত ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন তালেবপুর হাইস্কুল থেকে। এরপর ইন্টারমিডিয়েট পড়েন বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে পাস করে চলে আসেন ঢাকায়। সেটা ১৯৪৮ সাল। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৫১ সালে অনার্স পরীক্ষায় পাস করেন। মামার সঙ্গে তিনি থাকতেন ঢাকার পুরানা পল্টন লাইন এলাকার ‘বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন’-এ।
যেটুকু জানা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে পুলিশ যখন লাঠিচার্জ আর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করল, তখন অনেকেই সেই আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের প্রাঙ্গণে আশ্রয় নিয়েছিল। বরকত মেডিকেল কলেজের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। বেলা তিনটার দিকে পুলিশের ছোড়া বুলেটের আঘাতে তিনি লুটিয়ে পড়েন। কয়েকজন ছাত্র তাঁকে মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু বরকতকে বাঁচানো যায়নি। রাত ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে বরকত মারা যান।
২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদ বরকতকে কবর দেওয়া হয়।
আবুল বরকত ছিলেন মৌলভি শামসুদ্দীন ও হাসিনা খাতুন দম্পতির ছেলে। ছিলেন ৩ বোন ও ২ ভাইয়ের মধ্যে ৪র্থ। বড় তিন বোন ও ছোট এক ভাই ছিল তাঁর।
২০০০ সালে সরকার শহীদ বরকতকে একুশে পদকে ভূষিত করে।২
আরেকটু বিশদভাবে বিষয়টি বলা হলো:
ভাষা শহীদদের মধ্যে একমাত্র আবুল বরকতই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯২৭ সালের ১৬ জুন তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কান্দি মহকুমার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে তার জন্ম। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে আবুল বরকত ছিলেন সবার বড়।
১৯৪৭ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে তিনি প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন। তিনি থাকতেন পুরানা পল্টনের বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে মামার বাড়িতে।
১৯৫১ সালে আবুল বরকত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান লাভ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় বরকত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ইহেমে ক্লাসের ছাত্র ছিলেন।
২১ ফেব্রুয়ারি বেলা তিনটা কি সোয়া তিনটার দিকে ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে যখন তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয় তখন ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক হোটেলগুলোর সামনে জড়ো হয়েছিল। বরকত ছিলেন ১২ নং ব্যারাকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পুলিশ গুলী ছুঁড়লে সেখানেই লুটিয়ে পড়ে ছিলেন বরকত। এ ব্যাপারে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেছেন, ‘আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন হোস্টেল গেটের পশ্চিম দিকে অবস্থিত ১২নং গেটের সামনে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান শামসুল বাড়ি নিয়া মোহন এবং মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শফিকুর রহমান। হোস্টেল থেকে হাসপাতালে যাওয়ার ভেতরকার ছোট গেট (ছাত্রদের আসা-যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত) দিয়ে তারা বরকতকে হাসপাতালে নিয়ে যান সে সময় আরো কয়েকজন ছাত্র তাদের সাহায্য করেন।
ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক, হাসান হাফিজুর রহমান ও ড রফিকুল ইসলামের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আবুল বরকত খুব বেশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন এবং শামসুল হক যখন রেস্তোরাঁয় বসে তার বক্তব্য পেশ করেছিলেন তখন বরকত ও উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। গাজীউল হক বরকতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি শুনেছিলেন রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে। বরকত কে জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়েছিলেন মিয়া মোহন। তিনি রফিকুল ইসলামকে বলেছিলেন যেন বরকতের বাড়ির ঠিকানায় খবরটি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। রফিকুল ইসলাম বরকতের বাড়িতে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
শামসুল বাড়ি বা মিয়া মোহন ঘটনাটি বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে, ‘২০ নম্বর ব্যারাকের মাঝে মাঝে কামরার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জিরোচ্ছিলাম। আমার দিকে এগিয়ে এলেন বরকত। ডাকলাম আড়াই। বীরভূম জেলার সউড়ির সৈয়দ জাকির সাহেবের আত্মীয়, জাকির সাহেবের ফরিদপুরের চাকরি কালে আবাই মামুর সাথে পরিচয়। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন কিন্তু পড়ে গেলেন সাথে সাথে আমার হাত খানেক দূরে। পুলিশ ঢুকে পূর্ব থেকে সোজা গুলি ছুড়ছে। শফিকুর রহমান ১৭ নম্বরে থাকতেন, দৌড়ে এসে পানি ঢেলে দিলেন। ভেবেছিলেন টিয়ার গ্যাসের প্রতিক্রিয়া। আমি গুলির কথা বললাম, ততক্ষনে পানির সাথে সাথে রক্ত দেখা দিয়েছে বারান্দার মেঝেতে। তলপেটে লেগেছে গুলি। গায়ে ছিল তার নীল রংয়ের ফ্লাইং হাফ শার্ট, পরনে খাকি প্যান্ট, পায়ে কাবুলি সেন্ডেল। তখন তার দুই ঠ্যাং শফিকুর রহমান কাঁধে তুলে নিলেন আর মাথা নিলাম আমার কাঁধে। আমরা পশ্চিম দিক দিয়ে একটু ঘুরে দৌড়াতে লাগলাম তার দীর্ঘ সুঠাম দেহটা নিয়ে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল তার ও কোমরের নিচের দিকে ঝুলে দুমড়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছিল। আমার কাছে পানি চাইল কিন্তু কোথায় পানি সময় নাই ভেজা রুমালটা দিলাম চুষতে। হোস্টেলের পায়খানাগুলোর কাছ দিয়ে হাসপাতালে যাবার যে ছোট গেটটা ছিল তার কাছে আসতে দু-তিনজন এগিয়ে এলেন সাহায্য করতে, আমার কাছে দিলাম তার কোমরে। যেসে বলল ‘খুব কষ্ট হচ্ছে বাঁচবোনা। বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন পুরানা পল্টনে সংবাদ পৌঁছে দিন।’
তাকে নিয়েই ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে নামালাম। কেউ কেউ কেঁদে ফেলল।৩
রফিকুদ্দিন আহমদ
বিয়ের কথাবার্তা চলছিল তাঁর। পড়তেন মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে। আইকম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। একসময় পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন। বাবার প্রেসে কাজ করতেন তিনি। আসল বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামে। মরহুম আবদুল লতিফ আর রফিজা খানমের বড় ছেলে তিনি।
রফিকুদ্দিন রমনা এলাকায় বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সঙ্গে ছিলেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রজনতার মিছিলের একজন ছিলেন তিনি। বিকেলের দিকে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে একটি গুলি এসে রফিকুদ্দিনের মাথায় লাগে। মাথার মগজ বেরিয়ে যায়। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মারা যান।
বিকেল তিনটার দিকে মাথার খুলি উড়ে যাওয়া রফিককে মেডিকেল কলেজের ছাত্র হুমায়ুন কবির হাই, মশাররফুর রহমানেরা জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। প্রখ্যাত আলোকচিত্রী আমানুল হক রফিকের মৃতদেহের একটি ছবি তোলেন।
ভাষাশহীদ রফিকের লাশ গোপনে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এত দিন পর আর জানার উপায় নেই, ঠিক কোন জায়গায় রফিককে সমাহিত করা হয়েছিল, কারণ সেই কবরটি সংরক্ষিত ছিল না। ফলে পরে আরও অনেকের কবরই সেখানে দেওয়া হয়।
২০০০ সালে সরকার শহীদ রফিকুদ্দিন আহমদকে একুশে পদকে ভূষিত করে।৪
একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ। সেকালে মানুষের জন্ম সাল ও তারিখ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছিল। তাই ভাষা শহীদ রফিকের জন্ম সাল ও তারিখ ঠিক আছে কিনা,সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে পত্র-পত্রিকা এবং গবেষকদের লেখা থেকে মনে করা হয় যে,১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর শনিবার রফিকউদ্দিন আহমদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার সিংগাইর থানার বলধায়া ইউনিয়নের পারিল গ্রামে জন্মেছিলেন রফিক।
তাঁর পিতা ছিলেন আবদুল লতিফ এবং মা রাফিজা খাতুন। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। তিনি মারা যান ১৯৬২ সালে। মা মারা যান ১৯৮৯ সালে।
গ্রামের বাড়িতেই কেটেছিল রফিকের বাল্যকাল।
রফিক উদ্দেন আহমদের ভগ্নিপতি মোবারক হোসেন খান তাঁর সম্পর্কে যে স্মৃতিচারণ করেছেন, তাতে রফিকের শৈশব ও কৈশোর সম্পর্কে বেশ অনেক তথ্য পাওয়া যায়। পারিল নওয়াধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় রফিকের শিক্ষাজীবন। কিছুদিন তিনি লেখাপড়া করেছেন কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউশনে। বায়রা হাই স্কুলে ভর্তি হন তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে। এই স্কুল থেকেই মেট্রিক পাশ করে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে তিনি ভর্তি হন বাণিজ্য বিভাগে। এখানেই প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত পরীক্ষা না দিয়ে রফিক চলে আসেন ঢাকায়। রফিকের ভাই খোরশেদ আলম বলেছেন, ঢাকায় এসে তিনি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন।
রফিক তার বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। বাবার ছিল পারিল প্রিন্টিং প্রেস। এই প্রেস দেখাশুনা করতে করতেই তার কর্মজীবনের শুরু হয়। পারিবারিক ভাগাভাগি কারণে প্রিন্টিং ব্যবসা আর করবেন না বলে তার বাবা মনে করেন। কিন্তু রফিক সেই প্রেসের বন্টনকৃত মালামাল নিয়ে কমার্শিয়াল প্রিন্টিং প্রেস নাম দিয়ে আরেকটি প্রেস দাঁড় করান এবং তার ব্যবসা চলতে থাকে। যে সময়ে রফিক শহীদ হন তখন তিনি সেই প্রেস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
রফিকের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কনে ছিলেন তারই প্রতিবেশী ও চাচাত বোন রাহিজা খানম পানু বিবি। রফিকের বাবা ঢাকায় এসেছিলেন বিয়ের জন্য রফিককে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যেতে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়নি। রফিকের অনুজ আব্দুর রশিদের সঙ্গে পরে রফিকের বাগদত্তা পানু বিবির বিয়ে হয়।
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক লিখেছেন রফিকের শহীদ হওয়ার ঘটনাটি। তিনি লিখেছেন, ‘বেলা প্রায় তিনটা সোয়া তিনটার দিকে ক্ষ্যাপা পুলিশ শেষ পর্যন্ত ঢুকে পড়ল ফুলার রোড থেকে ব্যারাকের গেট দিয়ে। তারপর বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি। কেউ এমনটা ভাবতে পারেনি, তাই বুঝতে পারিনি যে গুলি চলছে বা টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটছে। পড়ে গেল রফিক উদ্দিন মাথায় গুলি লেগে, মগজ কিছুটা বেরিয়ে রক্তে ঘাসে মাখামাখি।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন জিএস ভাষাসংগ্রামী কর্নেল অব. ডাক্তার শরফুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বেলা প্রায় পৌনে তিনটা হবে। বিনা ওয়ার্নিং’-এ পুলিশ ছাত্র জনতার উপর গুলি ছুড়তে আরম্ভ করল। আমার অবস্থান থেকে প্রায় তিন গজ দূরে ভিড়ের মধ্যে ২০–২২ বছরের একটি ছেলে রক্তঝরা একটা মাথার খুলির উপরের অংশটা বাটির মতো হাতের তালুতে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, এই দেখুন পুলিশের নৃশংসতা, তাকিয়ে দেখলাম বাটির মতো মাথার খুলির অংশটিতে রয়েছে রক্তময় কিছু মাথার ঘিলু আর তা থেকে ছেলেটির হাতের আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কি নিদারুণ এদৃশ্য পরে জানা গেল এটা ছিল শহীদ রফিকের মাথার খুলির অংশ।
আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক শহীদ রফিকের গুলিবিদ্ধ মাথার খুলিসহ ছবিটি তুলেছিলেন। ভাষাসংগ্রামী হুমায়ুন এ এম হাই গবেষক এম আর মাহবুবকে জানিয়েছিলেন যে, ভাষা শহীদ রফিকের আরেকটি ছবি তুলেছিলেন তাঁর সহপাঠী সিরাজ জিন্নাত।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি কবিতাটি। পরে তা একুশের গান হিসেবে সমধিক পরিচিত হয়। এই গানের প্রথম সুর করেছিলেন আব্দুল লতিফ এবং পরে আলতাফ মাহমুদ।
গাফফার চৌধুরী এই কবিতাটি লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন গুলিবিদ্ধ রফিকের মরদেহ দেখে।৫
আবদুল জব্বার
আবদুল জব্বারের জন্ম ১৯১৯ সালে। বাবা হাসেম আলী শেখ, মা সাফিয়া খাতুন। থাকতেন ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে। পড়াশোনা করেছিলেন স্থানীয় পাঠশালায়। কিন্তু সেটা বেশিদূর এগোয়নি। তাই তিনি ছেড়ে দিলেন লেখাপড়া। চাইলেন বাবাকে চাষবাসে সহযোগিতা করতে। সে কাজটাই করছিলেন ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত। এরপর হঠাৎ তাঁর মনে হলো রোজগার বাড়াতে হবে। বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি একদিন চড়ে বসলেন ট্রেনে। চলে এলেন নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ তখন বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রাচ্যের ড্যান্ডি নামে বিখ্যাত।
নারায়ণগঞ্জের জাহাজঘাটেই এক সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো আবদুল জব্বারের। জব্বারকে পছন্দ হলো সাহেবের। তাঁরই সহায়তায় একটি চাকরি নিয়ে জব্বার চলে গেলেন বার্মায়। সেখানে আয়ত্ত করলেন ইংরেজি ভাষা। থাকলেন ১২ বছর। তারপর ফিরে এলেন দেশে।
তত দিনে বিয়ে করেছেন জব্বার। এরপর ১৯৫২ সালে তিনি এলেন ঢাকায়। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী আর শাশুড়ি। ক্যানসার-আক্রান্ত শাশুড়িকে ভর্তি করিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তখন চলছে ভাষা আন্দোলন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মেডিকেল প্রাঙ্গণে যে বিশাল জনসমাবেশ হয়েছিল, সেখানেই ছিলেন জব্বার। অন্য অনেকের মতোই যোগ দেন সেই অসাধারণ ইতিহাসের অংশ হিসেবে। ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালালে জব্বার গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি অবস্থায় সে রাতেই তিনি মারা যান।
আবদুল জব্বার স্ত্রী ও চার বছরের এক পুত্র রেখে শহীদ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম আমেনা খাতুন ও ছেলের নাম নূরুল ইসলাম বাদল। ২০০০ সালের তিনি মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।৬
২১শে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার আব্দুল জব্বার শাহাদাত বরণ করেন। সেদিন সকালে তিনি আব্দুল হাইকে নিয়ে নাস্তা করে শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করার জন্য হাসপাতালে যান। বেলা দুইটায় আব্দুল জব্বার মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে আসেন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করার জন্য। সে সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ এবং ছাত্র-জনতা মারমুখী অবস্থান নেয়। ডক্টর সিরাজের সঙ্গে কথা বলে আব্দুল জব্বার বিকেল তিনটের পরে রাস্তায় বের হন এবং ছাত্র জনতার মিছিলে মিশে যান। তিনটার পর পুলিশ ছাত্রজনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের পাশাপাশি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। প্রথমে গুলি লাগে আব্দুল জব্বারের ডান হাঁটুতে। একের পর এক গুলি চলতে থাকলে ছাত্রজনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে শুরু করে। আব্দুল জব্বার গুলিবিদ্ধ অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এলাকা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় আরেকটি গুলি এসে তার কোমরে বিদ্ধ হয়। ছাত্রজনতা তাঁকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। তাঁর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ফলে ডাক্তাররা অপারেশনের আগেই তার জীবনের আসা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। হাঁটু থেকে গুলি বের করা হয় কিন্তু কোমরের আঘাতকে কোনভাবেই চিকিৎসকেরা সামাল দিতে পারেননি। আব্দুল জব্বার জ্ঞান হারাননি। তিনি নিজ মুখে তার স্ত্রী ও একজন পুত্র সন্তান আছে বলে জানান।
রাত আটটার পর আব্দুল জব্বারের মৃত্যু হয়। আজিমপুর গোরস্থানে তাঁর দাফন হয়। দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন আব্দুল জব্বারের মায়ের দিকের আত্মীয় গফরগাঁওয়ের দুগাছিয়া গ্রামের লাল মিয়া। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গ্রামের পাশের বাড়ির মজিদের ভাগ্নে আহমদ আব্দুল জব্বারের ছোট ভাই আব্দুল কাদিরকে জব্বারের মৃত্যুসংবাদ দিয়ে টেলিগ্রাম করেন।৭
সফিউর রহমান
ভাষাশহীদ সফিউর রহমান ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের একজন কর্মচারী। ১৯১৮ সালে তাঁর জন্ম। জন্মেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগর গ্রামে। কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ থেকে তিনি আইকম পাস করেন। পড়াশোনা আর এগোয়নি। দারিদ্র্য তাঁকে চাকরিজীবী হতে বাধ্য করে। চাকরিরত অবস্থায়ই দেশবিভাগ হয়। তিনি আর পশ্চিমবঙ্গে থাকেননি। স্ত্রী আকিলা বেগমকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। কেরানির কাজ নেন হাইকোর্টে।
সফিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হন ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন সকালে তিনি সাইকেলে করে নবাবপুর রোড দিয়ে তাঁর অফিসে যাচ্ছিলেন। সে সময় পুলিশের একটি গুলি এসে তাঁর শরীরে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি মারা যান। চিকিৎসকেরা যখন সফিউর রহমানের দেহে অস্ত্রোপচার করছিলেন, তখন হাসপাতালে তাঁর বৃদ্ধা মা, বাবা, স্ত্রী ও মেয়ে শাহনাজ উপস্থিত ছিলেন।
সফিউরের মৃত্যু হলেও তাঁর লাশ স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়নি। আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। কবরটি এখনো আছে।
সফিউর রহমানের মৃত্যুর তিন মাস পর তাঁর একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তাঁর নাম রাখা হয় সফিকুর রহমান।
২০০০ সালে ভাষাশহীদ সফিউর রহমানকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়।৮
সফিউর রহমান মারা যান বাইশ ফেব্রুয়ারি সকালে। সকাল দশটায় তিনি বাসা থেকে বের হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। আগের দিন পুলিশ গুলিবর্ষণ করেছিল। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে এখানেও মিছিলকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। একটা গুলি এসে সফিউর রহমানের পিঠে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর এলিনসনের তত্ত্বাবধানে তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছটার দিকে শফিউর রহমান মারা যান।
১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা’ বইতে শফিউর রহমানের মৃত্যুর ব্যাপারে তার ছোটভাই তৈয়বুর রহমানের বরাতে বলা হয়েছে, ‘সকাল এগারোটা কি সোয়া এগারটার দিকে তিনি বেরিয়েছিলেন। তখন এক বিরাট মিছিল যাচ্ছিল নওয়াবপুর রোড দিয়ে। মরণচাঁদের দোকানের সামনে যখন তিনি, তখন গুলি হয়। গুলি লাগে তাঁর পিঠে। তবুও সাইকেল চালিয়ে তিনি কিছুটা যান কিন্তু খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে এসে পড়ে যান।’৯
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ বইয়ে সফিউর রহমানের মৃত্যু সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে সময় মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলের ছাত্র মাহবুবুর রহমান তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন যে তাঁর বন্ধু আসজাদুর রহমানের বড় ভাই অফিস যাত্রী সফিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছেন জেনে তিনি সেখানে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন অস্ত্রোপচার হয়েছে। হৃদপিন্ডের পাশ থেকে রক্তাক্ত বুলেট বেরুলো। কিন্তু তাকে বাঁচানো গেল না।’
এরপর আমরা পাচ্ছি, ‘স্মৃতিচারণ করে আকিলা খাতুন বলেন, আমার শাশুড়ি বলেছিলেন ওর কবরের জায়গাটা কিনে দিস। ওর মেয়ে শাহনাজ এবং গর্ভজাত শিশু যাতে তাদের বাবার একটি স্মৃতি চিহ্ন খুঁজে পায়। আমি আমার জমানো ১০০ টাকা উনাদের হাতে দিলাম। এখন এই কবর বাঙালি জাতির অমর স্মৃতি হয়ে আছে। তিনি মারা গেছেন শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায়, রবিবার রাতে আজিমপুর কবরস্থানে কবর দেয়া হয়। আমার শ্বশুর ও দেবর ট্রলির উপর শোয়ানো আমার স্বামীকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখেন। তার তখনও জ্ঞান ছিল। হাতে ঘড়ি ও হীরার আংটি ছিল। পকেটে ছিল কুড়ি টাকা।… তিনি তখন বারবার শাহনাজের কথা বলছিলেন। ‘আমার শাহনাজ আমার শাহনাজ।’১০
আকিলা খাতুনের সঙ্গে শফিউর রহমানের বিয়ে হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ২৮মে। তিনি ছিলেন কলকাতার মৌলভী তমিজউদ্দিন আহমেদের কন্যা। আকিলা খাতুনের ফুপু ছিলেন শফিউর রহমানের মা। ১৯৫২ সালে তারা ঢাকার আজাদ সিনেমা হলের কাছে ৬ নং রঘু লাল দাস লেনে বসবাস করতেন। যে শাহনাজের কথা বলা হলো, সে ছিল আকিলা-শফিউরের একমাত্র সন্তান। শাহনাজের বয়স তখন ছিল তিন বছর। শফিউর রহমানের মৃত্যুর তিন মাস পর তাদের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয় শফিকুর রহমান।
অহিউল্লাহ
রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানের নাবালক ছেলে অহিউল্লাহ। বয়স আট বা নয়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে। ২১ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ ঘটনার পর ২২ ফেব্রুয়ারি সারা ঢাকার রাস্তা ছিল মানুষের দখলে। অহিউল্লাহ শহীদ হয় নবাবপুর রোডে। খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল শিশুটি। এ সময় গুলি এসে তার মাথায় লাগে। উড়ে যায় মাথার খুলি। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে অহিউল্লাহর লাশ গুম করে ফেলে। তাকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে, তা কেউ জানে না।১১
অহিউল্লাহ বয়স ছিল দশ। তিনি নিহত হয়েছিলেন ২২ ফেব্রুয়ারি। নবাবপুর রোডে সেদিন ছিল সেনাবাহিনীর তৎপরতা। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার ধারাবাহিকতায় সরকার কঠোর হয়েছিল এবং নবাবপুর রোডে সেনা মোতায়েন করেছিল। অহিউল্লাহ দাঁড়িয়ে ছিল খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে। তখন নবাবপুর রোড দিয়ে মিছিল যাচ্ছিল। সেই বিশাল মিছিল দেখার জন্য এগিয়ে এসেছিল অহিউল্লাহ। সাপ্তাহিক সৈনিকে একটি খবর বেরিয়েছিল ১৯৫৪ সালের শহীদ দিবস সংখ্যায়। গুলি লাগার পর অহিউল্লাহর পকেট থেকে নাকি একটি কাগজ উদ্ধার করা হয়েছিল। সে কাগজে আঁকা ছিল প্রজাপতি আর জীব–জন্তুর ছবি।
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আজাদ পত্রিকায় অহিউল্লাহর নিহত হবার খবর ছাপা হয়েছিল।
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক অহিউল্লাহ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অহিউল্লাহ শহীদ হন ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তখন তাঁর বয়স মাত্র আট বছর এবং তিনি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। তিনি ছিলেন রাজমিস্ত্রী হাবিবুর রহমানের ছেলে। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তার মৃত্যু সংবাদ দৈনিক আজাদে ছাপা হয়।’১২
আজাদের প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল নবাবপুরের ঘটনা। সে প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘বেলা প্রায় এগারোটার সময় রথখোলা ও নিশাত সিনেমা হলের মোড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি চলতি সামরিক ট্রাক হইতে অপেক্ষমাণ নিরীহ পথচারীদের উপর বেপরোয়াভাবে গুলী চালান হয় বলিয়া জানা গিয়াছে। ফলে একজন যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত ও দুইজন আহত হয়। আহতদের মধ্যে একটি বালককে বেয়নেট দ্বারা মাথায় আঘাত করা হয় বলিয়া জানা গিয়াছে। আরও প্রকাশ, সামরিক ট্রাকে করিয়া তাহাদের লইয়া যাওয়া হয়।’
আজাদের সংবাদে বেয়নেট চার্জে নিহত হওয়া বালকটিই অহিউল্লাহ কিনা, সেটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে, গুলিতে নিহত বলতে গিয়ে যদি আজাদ পত্রিকা বেয়নেট চার্জের কথা বলে থাকে, তাহলে এই বালকটির অহিউল্লাহ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর যদি তা না হয়, তাহলে আরো একজন অজ্ঞাত ভাষাশহীদকে আমরা এখানে পাচ্ছি।
আহমেদ মওলা লিখছেন, ‘ক্ষিপ্ত পুলিশ ফুলার রোড দিয়ে ঢুকে মিছিলের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে।…গুলি লাগে কিশোর অহিউল্লাহর বুকে। পিচঢালা কালো রাস্তার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যায় অহিউল্লাহ। পুলিশ দ্রুত তার রক্তমাখা লাশ সরিয়ে ফেলে। গুম করে ফেলে অহিউল্লাহর লাশ।১৩
আবদুস সালাম
১৯২৫ সালে জন্মেছিলেন আবদুস সালাম। ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এখন গ্রামটির নাম সালাম নগর। মুন্সি আবদুল ফাজেল মিয়া তাঁর বাবা। মা দৌলতন্নেসা। বাবা ফাজেল মিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং ইরাকের বসরায় কর্মরত ছিলেন। চার ভাই, তিন বোনের মধ্যে সালাম ছিলেন সবার বড়।
কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর তিনি মাতুভূঞা কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর দাগনভূঞা আতাতুর্ক হাইস্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অর্থাভাবে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। কাজের খোঁজে এ সময় তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে তাঁর চাচাতো বোনের বাড়িতে যান। চাচাতো বোনের স্বামী আবদুল কাদের তাঁকে কলকাতা বন্দরে চাকরি জুটিয়ে দেন। ভারত বিভাগের পর সালাম ঢাকায় চলে আসেন। আজিমপুরের পলাশী ব্যারাকে থাকতে শুরু করেন। চাচাতো ভাই আবদুল হালিমের সহায়তার তিনি দিলকুশার ‘ডাইরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ’-এ পিয়ন পদে চাকরি নেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই তিনি কাজ করেছেন।১৪
ভাষাশহীদ আব্দুস সালাম গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ২১ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে তিনটায় মেডিকেল কলেজের সামনে। তিনি মারা গিয়েছিলেন সে বছরই ৭ এপ্রিল বেলা ১১ টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
৭ এপ্রিল সালামের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে সালামের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়নি। সালামের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তার পিতা মুন্সি আবদুল ফাজেল মিয়া এবং চাচাতো ভাই মকবুল। ভাষা শহীদ আবুল বরকত এবং ভাষা শহীদ শফিউর রহমানের কবর সংরক্ষণ করে আছে। আব্দুল জব্বারের কবরও শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আব্দুস সালামের কবর আজিমপুর গোরস্থানে ঠিক কোথায় আছে সেটি এখনও স্পষ্ট জানা যায়নি।
ভাষাশহীদ আব্দুস সালামের রক্তমাখা শার্টটি সংরক্ষন করেছিলেন তার পরিবার। কিন্তু একদিন সেটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। তার একটি ছবি সংরক্ষিত ছিল কিন্তু সেটি ভাষাসংগ্রামী খাজা আহমদকে পরিবারের পক্ষ থেকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর ছবিটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আরো একটি ছবি সংগ্রহ করেছিলেন ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য তালেব আলী। তালেব আলী ছবিটি দিয়েছিলেন জেনারেল এমএজি ওসমানীকে। কিন্তু তিনিও ছবিটি নিয়ে কী করেছেন, সে ব্যাপারে কিছু জানা যায় না।
১৯৫২ সালে তিনি থাকতেন নীলক্ষেত ব্যারাকে। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ২৭ বছর।১৫
আবদুল আওয়াল
একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল দৈনিক আজাদ ও দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায়। সেখানে বলা হয়েছিল, ৩৪০২ নম্বর লাইসেন্স পাওয়া রিকশার চালক আবদুল আওয়াল ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন। আজাদ পত্রিকায় এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল ১৯৫২ সালের ১৪ মার্চ।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘রিকশাচালকের লাইসেন্স’।
ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল বেচারাম দেউড়ি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটর দুর্ঘটনায় মোহাম্মদ হালিমের ছেলে আবদুল আওয়াল মারা যান। প্রথমশ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট জনাব ওবায়েদউল্লার উপস্থিতিতে মাওলানা আবদুল গফুর তার জানাজা পড়ান।
সহজেই প্রশ্ন জাগবে মনে, মোটর দুর্ঘটনায় নিহত একজন মানুষের জানাজায় একজন প্রথমশ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটকে কেন উপস্থিত থাকতে হলো?
১৯৫২ সালের ২৫ মার্চ দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আবদুল আওয়াল, C/O মোহাম্মদ হালিম। তাহার বয়স ২৬ বৎসর। সে রিকশা চালাইত এবং ১৯ নম্বর হাফিজুল্লা লেন মৌলভী বাজার ঢাকায় বাস করিত মোটর দুর্ঘটনার তাহার মৃত্যু হয়। জানাজার সময় তাহার কোনো আত্মীয় উপস্থিত ছিল না। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা জনাব ওবায়েদউল্লা জানাজার সময় উপস্থিত ছিলেন।
২২ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের স্মরণে যে গায়েবানা জানাজা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক প্রা্ঙ্গণে, সে জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন আবদুল আওয়াল। জানাজা শেষে শোক মিছিলেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। মিছিলটি কার্জন হলের সামনে এলে অতর্কিতে একটি মিলিটারি ট্রাক উঠিয়ে দেওয়া হয় মিছিলে। ট্রাকের নিচে পড়ে নিহত হন আবদুল আওয়াল। শোক মিছিল ছত্রভঙ্হ করার জন্যই যে মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং এই ঘটনাকে ‘মোটর দুর্ঘটনা’ বলা সমীচীন নয়।
এ ব্যাপারে গবেষক এম আর মাহবুব লিখছেন, আবদুল আওয়ালের সাথে সেদিন কার্জন হল এলাকায় আরও নাম-পরিচয়হীন এক বালকও ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে শহীদ হয়েছিল। আবদুল আওয়াল ছিলেন বিবাহিত। ‘বসিরন’ নামে তার একটি কন্যাসন্তানও ছিল। ভাষাশহীদ আবদুল আওয়াল সম্পর্কে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, ‘দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক মিল্লাতে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় যে, ২২ ফেব্রুয়ারি রিকশাচালক আবদুল আওয়াল (রিকশা লাইসেন্স নং -৩৪০২) গুলিতে নিহত হন’ (সূত্র : ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব, পৃষ্ঠা-১৯৭) তিনি আরো বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে আবদুল আওয়াল নামে একজন রিকশাচালক ২২ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) নবাবপুর রোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার পিতার নাম মোহাম্মদ হালিম। তাকে আজিমপুর গোরস্তানে সরকারি তত্ত্বাবধানে অজ্ঞাত স্থানে সমাহিত করা হয়।’ (সূত্র : ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসংগ্রামীগণ পূর্বোক্ত পৃ-২৬)
বশীর আল হেলাল ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৪৮৩) বলেন, “আবদুল আওয়াল সম্পর্কে উক্ত সরকারি বিবরণে বলা হয় : ‘মোহাম্মদ হাশিমের ছেলে মোটর দুর্ঘটনার মারা যায়। জনাব ওবায়দুল্লার উপস্থিতিতে পূর্বোক্ত ঈমামই তাহার জানাজা পড়েন।”
ভাষাশহীদ আবদুল আওয়ালের কন্যা বসিরনকে দিয়ে
শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন
‘বর্তমান শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ভাষাশহীদ আবদুল আওয়ালের ৬ বছরের কন্যা বসিরন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “শহীদ মিনারের স্থান নির্বাচন সম্পর্কে ছাপ্পান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি সংবাদে লেখা হয়, এপিপি পরিবেশিত এক খবরে বলা হইয়াছে যে, পূর্ত সচিব (মন্ত্রী) জনাব আবদুল সালাম খান মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ‘শহীদ মিনারের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য চূড়ান্তভাবে একটি স্থান নির্বাচন, এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন করিয়া উহা যত সত্বর সম্ভব সরকারের নিকট পেশ করার জন্য সরকারি স্থপতিকে নির্দেশ দিয়াছেন।
‘পূর্তমন্ত্রী আবদুস সালাম কর্তৃক শহীদ মিনারের স্থান নির্বাচন এবং পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ আয়োজন করার সংবাদটিতে প্রচার হয়ে পড়ে যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের যে স্থানটিতে পুলিশের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত নিহত হইয়াছিলেন সেখানে সরকার রাতারাতি একটি ‘শহীদ মিনার’ গড়িবার আয়োজন করিতেছেন। খবরটি প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক বিরাট জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় জমাইয়া দেখিতে পায় যে জনৈক মন্ত্রী প্রস্তাবিত মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য প্রস্তুত হইতেছেন। জনতা ইহাতে প্রবল আপত্তি জানায়… ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহীদ রিকশাচালক আওয়ালের ৬ বৎসর বয়স্কা কন্যা বসিরনকে দিয়া জনতা ইহার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করায়। এভাবে ছাপ্পান্ন সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্র-জনতা কর্তৃক বায়ান্নোর শহীদ আওয়ালের কন্যা বসিরনকে দিয়ে অনানুষ্ঠানিভাবে বর্তমানে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। (সূত্র : অমর একুশে ও শহীদ মিনার, পরমা, ফেব্রুয়ারি, পৃ-৫০-৫১)’১৬
সিরাজুদ্দিন
২২ ফেব্রুয়ারি একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছিলেন যে, পুলিশ ও ইপিআর গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে তুলে নিয়ে যায়। এদের মধ্যে আহদ ও নিহত দুই–ই ছিলেন। কলতাবাজারের নান্না মিয়া (তাঁর আরেক নাম সেরাজুদ্দিন) ‘নিশাত’ সিনেমা হলের উল্টোদিকে সিরাজুদ্দিন নামের এক যুবককে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। এ সম্পর্কে কোনো পত্রিকায় কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি। সিরাজুদ্দিনের বাড়ি ছিল তাঁতীবাজারের বাসাবাড়ি লেন।১৭
ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক কলতাবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সেরাজুদ্দিনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। অরাজনৈতিক এই ব্যক্তি সিরাজুদ্দীন যে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, তার সাক্ষী। আহমদ রফিক লিখছেন, তরুণ সেরাজুদ্দিন বাবুবাজার থেকে চলমান মিছিলে অংশ নিয়ে সদরঘাট পৌঁছান। একটু এগিয়ে জনসন রোডে ‘মর্নিং নিউজের ছাপাখানার কাছাকাছি জমায়েত লোকজনকে দেখতে দেখতে এগিয়ে যান। তৎকালীন ভিক্টোরিয়া পার্ক (বাহাদুর শাহ পার্ক) পেরিয়ে পরিপুষ্ট চেহারা মিছিলের সাথে এগিয়ে যেতে যেতে দেখেন, রথখোলার সামনে দাঁড়ানো সেনাবাহিনীর ট্রাক। ওদের চকচকে আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর দিকে একনজর তাকিয়ে নির্ভয়ে মিছিল এগিয়ে যায় শ্লোগানে শ্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে।
‘তিন চারজনের সারির বলিষ্ঠ মিছিল এগিয়ে চলে। দূরে দেখা যায় উত্তরদিক থেকে ছুটে আসা সৈন্য বোঝাই একটি ট্রাক ‘চৌধুরী সাইকেল মার্ট’ বরাবর এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। এদিকে মানসী সিনেমার গলি থেকে পুলিশ ও সৈন্যদের একটি অংশ দ্রুত হেঁটে গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। আর তখনি এগিয়ে আসা ট্রাক থেকে গুলি ছুটে আসে। মিছিলের কয়েকজন পড়ে যায়। তার মধ্যে একটি তরুণ তার ঠিক পাশেই আহত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে।, ঠিক কোমরের ওপর গুলি লেগেছে। সাদা শার্ট, প্যান্ট পরা সেই আহত ছেলেটি ছিল তাঁতিবাজারের (বাসাবাড়ি লেন), নাম সিরাজুদ্দিন। ছেলেটিকে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে নিয়ে যায়।

